প্রচ্ছদ প্রবন্ধ ১২ অক্টোবর আমাদের আনন্দ-বিষাদের দিন

১২ অক্টোবর আমাদের আনন্দ-বিষাদের দিন

108
0
সৈয়দ আনাস পাশা: ১২ই অক্টোবর আমি ও আমার স্ত্রীর একটি মিশ্র অনুভূতির দিন, আমাদের আনন্দ বিষাদের দিন। ২য় সহস্রাব্দের শেষ শতাব্দীর শেষ সময়ে ২০০০ সালের এই দিনে আমাদের কনিষ্ঠ সন্তান নাহিয়ান পাশা এই পৃথিবীতে এসে আমাদের যেমন আনন্দে ভাসিয়েছিলো, ঠিক তেমনি ১৯৯৪ সালের এই দিনে আমার ছোট ফুফু পরবর্তীতে শাশুড়ী সৈয়দা জিনতুন্নেছা খানমের নশ্বর পৃথিবী ত্যাগ বিষাদময় করে তুলেছিলো আমাদের সদ্য বিবাহিত রঙিন সময়। সেই হিসেবে আমাদের দুজনের জীবনে ১২ই অক্টোবর আনন্দ-বিষাদের দিন। পৃথিবীতে সদ্য আগত ছেলে নাহিয়ানকে রয়েল লন্ডন হাসপাতালের নার্সের আমার কোলে এনে দেয়া এবং সিলেটের আম্বরখানার একটি ক্লিনিকে চোখের সামনে আমার শাশুড়ীর ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া এ দুটো মুহূর্ত এখনও আমার চোখে ভাসে। আমাদের বিয়ের তিন মাসের মধ্যেই আমার শাশুড়ী চীরতরে ত্যাগ করেন এই ধরাধাম। আমরা ভাইবোনরা তাঁকে ডাকতাম ‘লাল ফুইঝি’। আমার হাতে উনার মেয়েকে তুলে দিয়ে তিনি এতই তাড়াতাড়ী চলে গিয়েছিলেন যে, লাল ফুইঝি ছেড়ে শাশুড়ী আম্মা ডাকার সুযোগও হয়নি আমার।
তিনি ছিলেন আমাদের বৃহত্তর পরিবারের সব ভাইবোনদের মানবিকতা শিক্ষার পাঠশালা। আমাদের তিনি শিখাতেন, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’।
শিশু বয়স থেকে তাঁর এই পাঠশালা থেকেই নীতি নৈতিকতার সবক পেয়ে পেয়ে আমরা বেড়ে উঠেছি। স্কুল শিক্ষিকা আমার এই ফুফু ছিলেন আমাদের অঞ্চলের নারী জাগরণের অন্যতম একজন অগ্রদূত। বড় ভাই আমার বাবা সৈয়দ আহবাব আলীর সহযোগিতায় মা সৈয়দা দ্রুোকসিন্দা বেগম ও বোন নুরজাহান খানমকে সাথে নিয়ে চল্লিশ দশকের শেষের দিকে নিজেদের বাড়ীতে বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এলাকার নারীদের মধ্যে শিক্ষার আলো পৌছে দেয়ার যে আন্দোলন শুরু করেছিলেন, সেটি তিনি চালিয়ে গেছেন আমৃত্যু। তিনি না থাকলেও শিশুদের মধ্যে এখনও শিক্ষার আলো পৌছে দিচ্ছে এলাকার মানুষের কাছে ‘জিনুর স্কুল’ (তাঁর ডাক নাম ছিলো জিনু) নামে পরিচিত তাঁর সেই স্কুল ‘সৈয়দপুর শামসিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়’।

ফেলে আসা শৈশব- কৈশোরের অনেক কথাই মনে পড়ে আজ।
আমাদের ছোটদের কাছাকাছি যতক্ষন থাকতেন লাল ফুইঝির কন্ঠে ততক্ষন অবিরত ধ্বণিত হতো রবীন্দ্র, নজরুলের কবিতা, গান ও মনিষিদের বাণী। তাঁর সাথে কন্ঠ মিলাতে হতো আমাদেরও। মনে আছে ছোটবেলায় কোন সহপাঠি আমাদের বাড়ীতে আসবার আগে খবর নিতো লাল ফুইঝি আছেন কি না, থাকলে আসতে চাইতোনা। বলতো, ‘গেলেই তোর ফুফু বলবেন কবিতা আবৃত্তি করতে, উত্তর দেয়া লাগবে আরও অগণিত প্রশ্নের’। নিজে নিজের স্বরচিত ছড়া কবিতাও দরাজ কন্ঠে আবৃত্তি করতেন আমাদের জটলায় এসে। এই আবৃত্তি তিনি কোলের শিশুদেরও নিয়মিত শুনাতেন। এমনও হয়েছে আমাদের ভাইবোনদের সন্তান যারা লাল ফুইঝির শেষ জীবনে পৃথিবীতে এসেছে তাদের অনেকেরই প্রথম মুখে কথা ফুটেছে নজরুলের কবিতা ‘চল চল..’ বা রবীন্দ্রনাথের ‘শুধু বিঘে দুই..’ উচ্চারণের মধ্য দিয়ে। আমাদের দুই ছেলে অবশ্য সে সুযোগ পায়নি। জন্মের আগেই তারা নানীকে হারিয়েছে।
স্কুল পরিদর্শনে থানা, জেলা বা উচ্চ পর্যায়ের কোন কর্মকর্তা আসার প্রোগ্রাম হলে তাদের স্বাগত জানাতে দিন কয়েক আগ থেকেই প্রস্তুতি নিতে হতো লাল ফুইঝির স্কুল শিক্ষার্থীদের। ফুল দিয়ে অতিথি বরণের লক্ষ্যে তিনি শিখাতেন গান-
‘এনেছি তাই ফুলের মালা
প্রীতি কৌতুহলে,
লও হে গুনি অগ্রগণ্য
পরো তুমার গলে।
বহুদুরও হতে আজি
নিয়ে জ্ঞান ও রত্নরাজি,
এসেছো হে সুধী বড়
আজি শুভ দিন,
ধন্য করো পূন্যে গৃহ
হয়ে সমাসীন।
মোদের তরে সয়ে গো ব্যথা
আজকে তুমি এলে এতা
ভাগ্য গুনে পেলাম আজি
তোমার দরশন
কি দিয়ে আজ করবো তুমায়
সাদর সম্ভাসন।
সুনাম তোমার স্বদেশ জুড়ে
জানে গো দেশ দেশান্তরে
আপন করে লওগো তুমি
জ্ঞানের আলো পথে,
কি দিয়ে আজ পূজবো তুমায়
পূজার বিধান মতে।
হৃদয় ভরা ভক্তি দিয়ে
সুবাস ভরা মিষ্টি ফুলে
নিয়ে এলাম তোমার তরে
লওগো দীনের দান
অবুজ মোরা নাইকো মোদের
বিদ্যা বুদ্ধি জ্ঞান।।’
এই গানটি শেষ হওয়ার সাথে সাথেই শিক্ষার্থীরা অতিথির গলায় ফুলের মালা পরিয়ে দিতেন।
ছোট বেলা থেকেই দেখতাম সূই সুতো দিয়ে কাপড়ের উপর তৈরী করা একটি আশির্বাদ বাণীর বাধাই করা ফ্রেইম টাঙানো থাকতো আমাদের ঘরের দেয়ালে।লেখাটি বার বার পড়তে পড়তে মুখস্ত হলেও এটির কোন গুরুত্ব বুঝতামনা বলে এটি তখন আমাদের কাছে মূল্যবান কিছু ছিলোনা। কিন্তু বয়স যখন বাড়লো, গুরুত্ব যখন বুঝলাম ফ্রেইমটি তখন আর নেই। আজ থেকে ২৫ বছর আগে নতুন ঘর তৈরীর সময় কোথায় যেন হারিয়ে গেছে এটি। এখন মনে হয় লাল ফুইঝির রচিত ওই আশির্বাণীটি আমাদের সন্তানদের জন্য কতবড় শিক্ষনীয় সম্পদ ছিলো। পৌঢ়ত্বে এসে ঐ আশির্বাণীটির ২/৩টি লাইন মনে থাকলেও পুরো আশির্বাণীটি ভুলে গেছি। বাবা, চাচা ও ফুফুসহ আমাদের ইমিডিয়েট পূর্ব প্রজন্মের এমন কেউ বেচেঁও নেই যাদের মেমোরী থেকে আশির্বাণীর কথাগুলো আবার রিকভার করবো।
আশির্বাণীর যে কটি লাইন স্মরণে আছে তা আর ভুলতে চাইনা। তাঁর বড়বোনের ছেলে, বৃহত্তর পরিবারের প্রথম সন্তান আমার বড় ফুফাতো ভাই সৈয়দ জগলুল পাশার জন্মকে স্বাগত জানিয়ে আশির্বাণীতে লাল ফুইঝি লিখেছিলেন,
‘জ্ঞানে তুমি হও বাছা
সিদ্দিকের মতো,
আজিও মরন যারে
পারেনি ছুঁইতে।
ধর্মে তুমি হও বাছা
আলী সদাশয়,
শৈশবে যে সত্য পথ
পারিলো চিনিতে।
ওমরের মত হও
বিনয়ী সু-ধীর,
আপন কর্তব্যে স্থীর
অটল অচল।
ওসমানের মতো হও
…………………।
বাকী লাইনগুলো আর মনে নেই।

তাঁর ঐ আশির্বাণী হতে প্রাপ্ত অনুপ্রেরণা থেকেই লাল ফুইঝির মৃত্যু দিবসে জন্ম নেয়া তাঁর সন্তানের সন্তান আমাদের ছোট ছেলে নাহিয়ানের জন্মদিনে এবার আমরা তাকে উপহার দিয়েছি মা-বাবার আশির্বাণী সম্বলিত একটি ক্যানভাস। আমাদের এই আশির্বাণী নাহিয়ানের জীবনে ফলবে কি না জানিনা, শুধু শান্তনা থাকবে এটিই যে, পূর্ব প্রজন্মের দিয়ে যাওয়া শিক্ষায় যেন আমাদের সন্তানরা শিক্ষিত হয় সেই চেষ্টাই আমরা করেছি।
পরপারে শান্তিতে থাকো আমাদের মানবিক শিক্ষার পাঠশালা
‘লাল ফুইঝি’।
আর
নানীর মৃত্যু দিবসে জন্ম নেয়া নাহিয়ানের ১৮তম জন্মদিনে আমাদের আশির্বাণী-উদ্ভাসিত হও আপন আলোয়।
লেখক: প্রধান সম্পাদক, সত্যবাণী ডটকম।