প্রচ্ছদ মতামত সিলেটের মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিনগুলি

সিলেটের মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিনগুলি

836
0

নজরুল ইসলাম বাসনঃ

১৯৬৫ সালে যখন ইন্ডিয়া- পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হয়েছিল তখন খুব ছোট ছিলামপ্রাইমারি স্কুলের একেবারে নীচের দিকে পড়তাম যুদ্ধ কি বোঝার কোন ক্ষমতাই ছিলনা, বড়রা যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করতেন,রেডিওতে সংবাদ শুনতেন তারা তারপরচলতো আলোচনা-সমালোচনা। তখন আমরা থাকতাম সিলেটের আম্বরখানাকলোনীতে, আমাদের আবাসিক এলাকায় বাংকার খোড়া হল, যদি ইন্ডিয়ার প্লেনআক্রমন করে তাহলে বাংকারে ঢুকে প্রান বাচাতে হবে,তবে ইন্ডিয়ার প্লেন আসেনি। ঐযুদ্ধের সময়ে কয়েকটি  শব্দের আমাদের পরিচয় ঘটে যেমন ব্লাক-আউট , রিফিউজি,ট্যাংক, ফাইটার ইত্যাদি,। অল্প বয়সেই আমাদের প্রজন্মের অনেকে এসব শব্দের সাথেপরিচিত হয়েছিলাম। ইন্ডিয়া-পাকিস্তান যুদ্ধের ৫/৬ বছর পরই ১৯৭০ সালে আমাদেরদেশে শুরু হল উতাল-পাতাল ঢেউ। আমাদের প্রজন্ম পরিচিত হল ইলেকশনের সাথে,নৌকা, পাল্লা,ছাতা, কুড়েঘর, খেজুর গাছ ইত্যাদির সাথেও আমরা পরিচিত হলাম। ঐসময় মিছিলের শ্লোগান জয়বাংলা, জয়বঙ্গবন্ধু,নৌকায় ভোট দিন, যা করে আল্লায়ভোট দিব পাল্লায় ইত্যাদি। ১৯৭০ সাল এর নির্বাচনের পর এল মুক্তিযুদ্ধ। আমরাতখন তারুণ্যের দ্বারপ্রান্তে স্কুলের শেষ দিকের ক্লাশে উঠে গেছি। চীনের মাও সে তুং,ইন্দোনেশিয়ার সুকর্ণ, কিউবার চে গুয়েভারা ইত্যাদি নেতাদের নামের সাথে পরিচিতহয়ে গেছি বইয়ের মাধ্যমে। এসব নেতাদের পাশা-পাশি  আমাদের দেশে নেতা হিসেবেদাড়ালেন মুজিব, ইলেকশনে নৌকা জিতে যাওয়ায় পাকিস্তানের ভাবি প্রধানমন্ত্রী, কিন্তুভুট্টোর ষড়যন্ত্রে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া সংসদ অধিবেশন স্থগিত করে দিলেন। আমাদেরস্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে গেল, কয়েকদিন পর অফিস-আদালত বন্ধ হয়ে গেল। দেশেরমানুষ বুঝতে পারছিল না কি হচ্ছে? ২৫ শে মার্চ রাত থেকে শুরু হল অপারেশন সার্চলাইট। মঞ্চে আসলেন এবার জেনারেল টিক্কা খান, নেতা মুজিবকে গ্রেফতার করেকরাচি পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হল।

সারা দেশ পাকিস্তানী সেনাদের বুটের নীচে, হত্যা, ধর্ষণ, জ্বালাও-পোড়াও এ পাকসেনারা মেতে উঠল। এ সময় চট্টগ্রামের কালুর ঘাট থেকে সেনা-বিদ্রোহের নেতামেজর জিয়া জাতিকে শোনালেন মুক্তিযুদ্ধের ঘোষনা। ভারতের মাটি থেকে প্রবাসিসরকার এর নেতৃত্বে সেক্টর কমান্ডারদেও নেতৃত্বে শুরু হল মুক্তিযুদ্ধ, প্রবাসিসরকারের নেতা মরহুম তাজ উদ্দিন আহমদ,কর্নেল ওসমানি সশস্ত্র বাহিনীরসর্বাধিনায়ক, চীফ অফ স্টাফ হলেন তৎকালিন লে: কর্নেল আব্দুর রব। ৯ মাস এইমুক্তিযুদ্ধে মেজর জিয়ার নেতৃত্বে জেড ফোর্স, মেজর শফিউল্লার নেতৃত্বে এস ফোর্স, কেফোর্স গঠিত হল মেজর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে। ১১টি সেক্টর গঠন করা হলএর নেতৃত্বে থাকলেন কমান্ডারবৃন্দ এদেও বেশির ভাগই মেজর এবং লে: কর্নেলপর্যায়ের বিদ্রোহী সেনা অফিসারবৃন্দ। এসব তরুন মেজররাই মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদিয়েছিলেন, তাদেও সাথে বেসামরিক অনেক তরুন নেতারা যেমন কাদের সিদ্দিকীরমত অনেকেই বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। ছাত্র-কৃষক-শ্রমিক ও তাদের সন্তানরাই অস্ত্রহাতে যুদ্ধ করেছে। এতো গেল বাংলাদেশের পক্ষের কথা।

এদিকে সিলেটের পাকিস্তানী বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন ব্রিগেডিয়ার ইফতেখার রানা।সিলেটের সার্কিট হাউস, রেসিডেন্টশিয়াল স্কুল(বর্তমান ক্যাডেট কলেজ) , সালুটিকরবিমান বন্দর ছিল পাক-বাহিনীর ক্যাম্প রেডিও স্টেশন,টেলিগ্রাফ অফিস,থানা, ডিসিঅফিসসহ সিলেট শহরের সকল গুরুত্বপুর্ন স্থাপনা ছিল মিলিটারির দখলে। খুব দ্রুতগতিতে পাকিস্তানি বাহিনী শহর-বন্দর, গ্রামে-গঞ্জের দখল নিয়ে নিল। পাকিস্তানিসেনাদের সহায়তার জন্যে তারা গঠন করল শান্তি কমিটি, রাজাকার , আল-বদর,আল-শামস বাহিনী। দখলদার বাহিনীর সাথে যারা যোগদিল তারা জাতির জন্যে এককলংকজনক অধ্যায়ের সৃষ্ঠি করলো। দখলদার বাহিনীর হাতে ধর্ষিত হতে লাগলোনারীরা,তারা বাছ-বিচার ছাড়াই হত্যা করতে লাগলো নিরস্ত্র জনগনকে। বাড়ীঘরজ্বালিয়ে দিল, লুট-তরাজ শুরু করলো।

এই যখন অবস্থা তখন বর্ডার এলাকায় পাক-বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের মুহুর্মুহুসংঘর্ষ চলতে লাগল, মুক্তিযোদ্ধারা কোন কোন এলাকায় মুক্তাঞ্ছল ও গড়ে তুলেছিলসেই সময়, রৌমারিতে এরকম একটি মুক্তাঞ্ছল গড়ে উঠেছিল এখন ইউটিউবে তাদেখতে পাওয়া যায়। মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিনগুলোতে সিলেটের মুক্তাঞ্চল দিয়ে ওয়ান ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর জিয়া তার বাহিনী নিয়ে আটগ্রাম-চারখাই হয়ে সিলেটপ্রবেশ করলেন। তার সহযোদ্ধা কর্নেল ওলি আহমদ এই প্রতিবেদককে একদিনবলেছিলেন তারা কি ভাবে সিলেট দখল করে এমসি কলেজের পাশে ক্যাটল ফার্মেআস্তানা গেড়েছিলেন। মেজর জিয়ার যুদ্ধের সময়কালিন এই তথ্য পাওয়া যায়ভারতীয় মিলিটারি জার্নালে। শুধু ভারতীয় সেনাকর্মকর্তারা নয়, পাকিস্তানী মিলিটারিনেতারাও যুদ্ধেও স্মৃতি নিয়ে লিখেছেন গ্রন্থ, প্রতিবেদন এর মধ্যে পাকিস্তানসেনাবাহিনীর তৎকালিন মেজর মমতাজ হোসেইন শাহ দি ব্যাটল অফ সিলেটফরটেস-শিরোনামে লিখিত এক প্রতিবেদনে যুদ্ধকালিন সময়ে তার ভুমিকার একটিবর্ণনা দিয়েছেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এসব সংঘর্ষের সীমিত খবরপাওয়া যেত,মুক্তাঞ্ছলে বিদেশি মিডিয়াও

(লেখকঃ  উপদেষ্ঠা সম্পাদক,লেখক, গবেষক)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here