প্রচ্ছদ নজরুল ইসলাম বাসনের কলাম সিলেটে মুক্তিযুদ্বের শেষের দিনগুলি

সিলেটে মুক্তিযুদ্বের শেষের দিনগুলি

610
0
নজরুল ইসলাম বাসন: ১৯৬৫ সালে যখন ইন্ডিয়া- পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হয়েছিল তখন খুব ছোট ছিলাম।প্রাইমারি স্কুলের একেবারে নীচের দিকে পড়তাম, যুদ্ধ কি বোঝার কোন ক্ষমতাই ছিল না। বড়রা যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করতেন, রেডিওতে সংবাদ শুনতেন, তারপর চলতো আলোচনা-সমালোচনা। তখন আমরা থাকতাম সিলেটের আম্বরখানা কলোনীতে। আমাদের আবাসিক এলাকায় বাংকার খোড়া হল, যদি ইন্ডিয়ার প্লেন আক্রমন করে তাহলে বাংকারে ঢুকে প্রাণ বাঁচাতে হবে, তবে ইন্ডিয়ার প্লেন আসেনি। যুদ্ধের সময়ে  আমাদের পরিচয় ঘটে কয়েকটি শব্দের যেমন; ব্লাক-আউট , রিফিউজি, ট্যাংক, ফাইটার ইত্যাদি।
অল্প বয়সেই আমাদের প্রজন্মের অনেকে এসব শব্দের সাথে পরিচিত হয়েছিলাম। ইন্ডিয়া-পাকিস্তান যুদ্ধের ৫/৬ বছর পর ১৯৭০ সালে আমাদের দেশে শুরু হল উতাল-পাতাল ঢেউ। আমাদের প্রজন্ম পরিচিত হল ইলেকশনের সাথে। নৌকা, পাল্লা, ছাতা, কুড়েঘর, খেজুর গাছ ইত্যাদির সাথেও আমরা পরিচিত হলাম। ঐ সময় মিছিলের শ্লোগান জয়বাংলা, জয়বঙ্গবন্ধু, নৌকায় ভোট দিন, যা করে আল্লায় ভোট দিব পাল্লায় ইত্যাদি।
১৯৭০ সাল এর নির্বাচনের পর এল মুক্তিযুদ্ধ। আমরা তখন তারুণ্যের দ্বারপ্রান্তে স্কুলের শেষ দিকের ক্লাশে উঠে গেছি। চীনের মাও সে তুং, ইন্দোনেশিয়ার সুকর্ণ, কিউবার চে গুয়েভারা ইত্যাদি নেতাদের নামের সাথে পরিচিত হয়ে গেছি বইয়ের মাধ্যমে। এসব নেতাদের পাশাপাশি আমাদের দেশে নেতা হিসেবে দাড়ালেন মুজিব।ইলেকশনে নৌকা জিতে যাওয়ায় পাকিস্তানের ভাবি প্রধানমন্ত্রী, কিন্তু ভুট্টোর ষড়যন্ত্রে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া সংসদ অধিবেশন স্থগিত করে দিলেন। আমাদের স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে গেল, কয়েকদিন পর অফিস-আদালত বন্ধ হয়ে গেল। দেশের মানুষ বুঝতে পারছিল না কি হচ্ছে? ২৫ শে মার্চ রাত থেকে শুরু হল অপারেশন সার্চ লাইট। মঞ্চে আসলেন এবার জেনারেল টিক্কা খান, নেতা মুজিবকে গ্রেফতার করে করাচি পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হল।
সারাদেশ পাকিস্তানী সেনাদের বুটের নীচে, হত্যা, ধর্ষণ, জ্বালাও-পোড়াও এ পাক সেনারা মেতে উঠল। এ সময় চট্টগ্রামের কালুর ঘাট থেকে সেনা-বিদ্রোহের নেতা মেজর জিয়া জাতিকে শোনালেন মুক্তিযুদ্ধের ঘোষনা। ভারতের মাটি থেকে প্রবাসী সরকার এর নেতৃত্বে সেক্টর কমান্ডারদের নেতৃত্বে শুরু হল মুক্তিযুদ্ধ। প্রবাসী সরকারের নেতা মরহুম তাজ উদ্দিন আহমদ, কর্নেল ওসমানি সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক, চীফ অফ স্টাফ হলেন তৎকালিন লে: কর্নেল আব্দুর রব। ৯ মাস এই মুক্তিযুদ্ধে মেজর জিয়ার নেতৃত্বে জেড ফোর্স, মেজর শফিউল্লার নেতৃত্বে এস ফোর্স, কে ফোর্স গঠিত হল মেজর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে। ১১টি সেক্টর গঠন করা হল এর নেতৃত্বে থাকলেন কমান্ডারবৃন্দ এদেও বেশির ভাগই মেজর এবং লে: কর্নেল পর্যায়ের বিদ্রোহী সেনা অফিসারবৃন্দ। এসব তরুণ মেজররাই মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাদের সাথে বেসামরিক অনেক তরুণ নেতারা যেমন কাদের সিদ্দিকীর মত অনেকেই বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। ছাত্র-কৃষক-শ্রমিক ও তাদের সন্তানরাই অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে। এতো গেল বাংলাদেশের পক্ষের কথা।
সিলেটের পাকিস্তানী বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন ব্রিগেডিয়ার ইফতেখার রানা। সিলেটের সার্কিট হাউস, রেসিডেন্টশিয়াল স্কুল(বর্তমান ক্যাডেট কলেজ) , সালুটিকর বিমান বন্দর ছিল পাক-বাহিনীর ক্যাম্প রেডিও স্টেশন, টেলিগ্রাফ অফিস, থানা, ডিসি অফিসসহ সিলেট শহরের সকল গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ছিল মিলিটারির দখলে। খুব দ্রুত গতিতে পাকিস্তানি বাহিনী শহর-বন্দর, গ্রামে-গঞ্জের দখল নিয়ে নিল।
পাকিস্তানি সেনাদের সহায়তার জন্যে তারা গঠন করল শান্তি কমিটি, রাজাকার , আল-বদর, আল-শামস বাহিনী। দখলদার বাহিনীর সাথে যারা যোগ দিল তারা জাতির জন্যে এক কলংকজনক অধ্যায়ের সৃষ্ঠি করলো। দখলদার বাহিনীর হাতে ধর্ষিত হতে লাগলো নারীরা, তারা বাছ-বিচার ছাড়াই হত্যা করতে লাগলো নিরস্ত্র জনগনকে। বাড়ীঘর জ্বালিয়ে দিল, লুট-তরাজ শুরু করলো।
এই যখন অবস্থা, তখন বর্ডার এলাকায় পাক-বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের মুহুর্মুহু সংঘর্ষ চলতে লাগল, মুক্তিযোদ্ধারা কোন কোন এলাকায় মুক্তাঞ্চল ও গড়ে তুলেছিল।সেই সময় রৌমারিতে এরকম একটি মুক্তাঞ্চল গড়ে উঠেছিল এখন ইউটিউবে তা দেখতে পাওয়া যায়।
মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিনগুলোতে সিলেটের মুক্তাঞ্চল দিয়ে ওয়ান ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর জিয়া তার বাহিনী নিয়ে আটগ্রাম-চারখাই হয়ে সিলেট প্রবেশ করলেন। তার সহযোদ্ধা কর্নেল ওলি আহমদ এই প্রতিবেদককে একদিন বলেছিলেন তারা কি ভাবে সিলেট দখল করে এমসি কলেজের পাশে ক্যাটল ফার্মে আস্তানা গেড়েছিলেন। মেজর জিয়ার যুদ্ধের সময়কালিন এই তথ্য পাওয়া যায় ভারতীয় মিলিটারি জার্নালে। শুধু ভারতীয় সেনাকর্মকর্তারা নয়, পাকিস্তানী মিলিটারি নেতারাও যুদ্বের স্মৃতি নিয়ে লিখেছেন গ্রন্থ। প্রতিবেদন এর মধ্যে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তৎকালিন মেজর মমতাজ হোসেইন শাহ ‘দি ব্যাটল অফ সিলেট ফরটেস’-শিরোনামে লিখিত এক প্রতিবেদনে যুদ্ধকালিন সময়ে তার ভুমিকার একটি বর্ণনা দিয়েছেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এসব সংঘর্ষের সীমিত খবর পাওয়া যেত, মুক্তাঞ্চলে বিদেশী মিডিয়াও আসতো। তখন পাক হায়েনাদের সঙ্গীনের সামনে অবরুদ্ধ ৭ কোটি মানুষ আশার পানে চেয়ে রইল কখন দেশ স্বাধীন হবে।
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর মিত্র বাহিনীর কাছে জেনারেল নিয়াজী ৯৩ হাজার পাক-সেনাসহ আত্মসমর্পন করলেন, জেনারেল অরোরা ছিলেন মিত্র বাহিনীর পক্ষে।শেষ হল নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ।
এখানে বলা আবশ্যক বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ দুটি পর্ব, একটি স্বাধিকার ও স্বাধীনতার রাজনৈতিক আন্দোলন। আর এই স্বাধীনতা সংগ্রামের একচ্ছত্র নেতা হয়ে উঠেছিলেন শেখ মুজিব।এ নিয়ে কোন বিতর্কের অবকাশ নেই, তিনি জনগনের ভোটে নির্বাচিত নেতা হয়েছিলেন। তবে মুক্তিযুদ্ধে তার অনুপস্থিতির কারনে রাজনৈতিক ও একাডেমিক বিতর্ক শুরু হল।
তার মৃত্যুর পর ক্ষমতার পট-পরিবর্তনের পর জিয়া উঠে আসলেন আলোচনায়।আওয়ামী লীগ সব ক্রেডিট নিতে চায়, আর বি ত্রন পি জিয়া কে মুজিবের সমান মাপে দাড় করাতে চায়। মুজিবের অনুপস্থিতি মুক্তিযুদ্ধের ময়দানে জিয়া ছিলেন অস্ত্রহাতে জেডফোর্সের নেতা, এখানেই যে যার মত করে মুজিব ও জিয়াকে বিচার করেন বা মুল্যায়ন করেন,আমি সে বিষয়ে আর বেশি এগুতে চাইনা।
মুক্তিযুদ্ধের সময় সিলেট শহরে ছিলাম অবরুদ্ধ অবস্থায়। দেশ স্বাধীন হবার  ৪৫ বছর পর লন্ডনে বসে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রোমান্থন করতে গিয়ে ব্যক্তিগত অনেক স্মৃতিই ভেসে আসে, আর এই স্মৃতির সাথে যদি মিলিটারি অফিসারদের লেখা তথ্য পাওয়া যায় তাহলে তা পাঠকদের কাছে তুলে ধরতে কার না মন চায় ।পাঠকদের জন্যে পর্যায়ক্রমে তুলে ধরার প্রয়াসে আজকের এই লেখা,এই লেখায় সিলেট অঞ্ছলের মুক্তিযুদ্ধের কথাই তবে প্রসংগক্রমে অন্যান্য বিষয় আসতে পারে। (চলবে)
লেখক: সাংবাদিক, কলামিষ্ট।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here