প্রচ্ছদ ফিচার বিলেতে বাঙালী দবির চাচা প্রেরণার উৎস

বিলেতে বাঙালী দবির চাচা প্রেরণার উৎস

0

নূরজাহান শিল্পী: গেল বছর থেকেই বিশ্বজুড়ে করোনার তাণ্ডব। দেশে দেশে শুরু হয় মৃত্যুর মিছিল। মানুষের মধ্যে অসহায়ত্ব, আতঙ্ক আর ভয়। কারও যেন কিছু করার নেই। বহুদূর ছিটকে পড়ে মানবতা, প্রেম ভালোবাসা। তবে বাঙালি জাতি হিসেবে আমাদের আন্তরিকতা, ত্যাগ তিথিক্ষার মধ্যেও অনেক কীর্তিমান সন্তান রয়েছেন। তাদের নিয়ে আমরা গর্ব করতে পারি। এমনই একজন কীর্তিমান দবিরুল ইসলাম চৌধুরী। মানুষের দু:সময়ে পাশে দাঁড়ানোর এক আলোকবর্তিকা।

বিলেতে মানবতার মিছিলে এক আলোকিত নাম। পিতৃতুল্য এই ব্যক্তি দবির চাচা হিসাবেই পরিচিত। সব্যসাচী ঘরানার এ কর্মবীর মানুষটি কল্যাণমূলক কাজের মধ্যদিয়ে অসাধারণ অবদান রেখেছেন। করোনার ভয় দূরে ঠেলে এগিয়ে এসেছেন মানবিক হয়ে। মানবতার সেবক হয়ে হাজির হন। নিজের জীবনের ঝুঁকি জেনেও কাজ
করেছেন সেসব মানুষের কল্যাণে। বিপদগ্রস্তদের পাশে দাঁড়িয়ে উৎসাহ যুগিয়েছেন। তিনি স্বপ্নবান একজন শতবর্ষী বাঙালি। সিলেটের দিরাই উপজেলায় জন্ম নেয়া এই বাঙালি ব্যক্তিত্ব বর্তমানে পূর্ব লণ্ডনের বো এলাকার বাসিন্দা। তাঁর মানবিকতার মহৎ কাজের জন্য ইতিপূর্বে তিনি রানীর কাছ থেকে অর্ডার অব দ্যা ব্রিটিশ এ্যাম্পায়ার (ওবিই) পদক প্রাপ্ত হয়েছেন।
আর্ত মানবতার সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার মধ্যেই রয়েছে জীবনের সার্থকতা। জীবনের উদ্দেশ্য শুধু নিজেকেই সুখী করা নয়, বরং অন্যকে সুখী করার মধ্যদিয়েই প্রকৃত সুখ পাওয়া যায়। গত দেড় বছর ধরে গোটা পৃথিবীর মানুষ করোনা ভাইরাসের কাছে অসহায়। অর্থনৈতিক শক্তির মেরুদণ্ড যখন ভেঙ্গে যায়
তখন এই অসহায়ত্ব আমাদের আরও আকড়ে ফেলে। অভাব, অনটন, চিকিৎসার্থ্য সংকট, আত্মীয় পরিজনের নানাবিধ সমস্যা আমাদের জন্য নতুন শিক্ষা নিয়ে আসে। অতিমারীর এই করোনা ভাইরাস বিভিষিকাময় জীবনের মুখোমুখি দাঁড় করায়। তবে এসময়ে দমে যাননি কীর্তিমান ব্যক্তি দবিরুল ইসলাম। প্রেরণার উৎস শতবর্ষী দবিরুল চাচা ব্যতিক্রমী মানবিক কাজে সময় ব্যয় করেছেন। রমজান মাসে পায়ে হেঁটে করোনা ভাইরাস তহবিলের জন্য দবিরুল ইসলাম প্রায় সাড়ে চার লক্ষ পাউণ্ড চাঁদা উত্তোলন করেন। এরপর তিনি রানীর সম্মানে ভূষিত হন। তাঁর এমন ব্যতিক্রমী মানবিকতায় শুধু সিলেট নয়, সমগ্র বাংলাদেশ তথা গোটা বিশ্বের কাছে একটি গৌরবাম্বিত নাম। দবির চাচা আমাদের প্রেরণার উৎস হলেও তিনি রয়েছেন প্রচার প্রচারনার আড়ালে।
তিনি একজন কবিতা প্রেমী। নিজে কবিতা পড়তে ও শুনতে ভালোবাসেন। কবিতা ও সাহিত্যের প্রতি তাঁর অবিরল চর্চাও রয়েছে। সম্প্রতি লণ্ডনের একটি অনুষ্ঠানে তাঁর কবিতা পাঠ হলভর্তি দর্শকদের মুগ্ধ করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “দুই বিঘা জমি“ কবিতাটি তিনি মুখস্ত পাঠ করেন। এই বয়সেও দবির চাচার কবিতা পাঠ শুনে দর্শকরা হতবাক হন। আল্লাহর দেয়া স্মরণ-শক্তি ও ক্ষমতা কতটুকু প্রখর তিনি তা প্রমাণ করলেন। চালচলনে একেবারেই সাবলিল। কটি অনুষ্ঠানে শতবর্ষী এই মহামানবকে স্বচক্ষে দেখে ও তাঁর সান্নিধ্য পেয়ে নিজেকে গর্ববোধ করছি। মহান এই ব্যক্তির প্রতি অশেষ শ্রদ্ধা।
দবিরুল ইসলাম চৌধুরীর জন্ম ১৯২০ সালে সিলেটের দিরাইয়ে। ইংরেজী সাহিত্য নিয়ে উচ্চ শিক্ষার আশায় ১৯৫৭ সালে তিনি বিলেতে পাড়ি জমান। এরপর তিনি সেন্ট অলবান্স শহরে বসবাস করেন এবং সেখানে একজন কমিউনিটি লিডার হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করেন। তিনি বিলেতের মাটিতে মানুষের কল্যাণে নিবেদিত এক প্রাণ ও মানবতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। গত রমজান মাসের প্রায় পুরোটা সময় দবিরুল ইসলাম নিজে রোজা রেখে করোনা ভাইরাসের জন্য তহবিল গঠনে বেরিয়ে পড়েন। বয়সে ভারাক্রান্ত তাকে করোনাও
আটকে রাখতে পারেনি। নিজের অদম্য শক্তি, স্পৃহা ও মনোবল নিয়ে তিনি তহবিল গঠনে শ্রম বিলিয়ে দেন। বাংলাদেশ, ব্রিটেন এবং আরো কিছু দেশের করোনা ভাইরাসে বিপর্যস্ত মানুষের সহায়তার জন্য অর্থ সংগ্রহই তার উদ্দেশ্যে ছিল। প্রতিদিন তাঁর বাড়ির পেছনের ৮০ মিটার বাগানে পায়ে হেঁটে ৯৭০ বার প্রদক্ষিণ করেন।
তিনি নিজের বাড়ির বাগানে পায়ে হেঁটে স্বাস্থ্য-কর্মীদের জন্য প্রায় সাড়ে তিন কোটি পাউ- চাঁদা উত্তোলন করেন। দবিরুল ইসলামের তহবিল গঠনের মহতি এই কাজ দেখে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর অবরসপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন টম মুর উৎসাহিত হন। তাকেও অনুপ্রেরণা দান করে। রমজান মাসের পুরোটা সময়ে এভাবে পায়ে হেঁটে
তিনি সর্বমোট ৪ লক্ষ ২০ হাজার পাউণ্ড সংগ্রহ করেন। এরমধ্যে ১ লক্ষ ১৬ হাজার পাউণ্ড দেয়া হয় স্বাস্থ্য বিভাগ এনএইচএস-কে। অবশিষ্ট অর্থ বিশ্বের ৫২টি দেশের ৩০টি দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দান করা হয়। তাঁর সংগৃহীত অর্থ করোনাকালীন এক দু:সময়ে বিপর্যস্তদের জন্য নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। একজন বাঙালী দবিরুল ইসলামের এমন মহতি উদ্যোগ আমাদের অনুপ্রেরণা যোগাক। বিলেতের মতো স্থানে মানবিকতার মহত ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আগামী দিনগুলোতে আমাদের তরুন প্রজন্ম অনুপ্রাণিত হয়ে উঠুক। শুধু নিজেদের ব্যক্তি সত্ত্বার মধ্যে নিয়োজিত না থেকে মানুষের কল্যাণে নিবেদিতরাই বেঁচে থাকে যুগ যুগান্তরে।
কবি রবি ঠাকুরের ভাষায়-“মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে, মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।“ বিলেতে বাঙালী দবিরুল চাচার মানবিকতা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়–ক। তাঁর কর্মচেষ্টায় তাঁকে আরো দীর্ঘায়িত করে তুলোক। সে প্রত্যাশাই করছি। সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে – দবিরুল চাচার এই
মানবিকতাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

কবি, লেখক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধজাতিসংঘ: বিশ্বে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে রেকর্ড
পরবর্তী নিবন্ধবই হোক নিত্যসঙ্গী