প্রচ্ছদ ফিচার বাংলাদেশ ব্যাংক এবং আতিউর উপাখ্যান, তারপরেও রাবিশ-খবিস বলার সাহসীকে দরকার

বাংলাদেশ ব্যাংক এবং আতিউর উপাখ্যান, তারপরেও রাবিশ-খবিস বলার সাহসীকে দরকার

711
0
SHARE

লন্ডনঃ সন্দেহ নাই, ডঃ আতিউর রহমান যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব নেন, তখন আজকের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতই নিজে উদ্যোগী হয়ে এই আতিউরকেই বেঁছে নিয়েছিলেন। শেখ হাসিনা যখন গভর্ণর লিস্ট বাছাই করছিলেন, মুহিত তখন স্ব-উদ্যোগে আতিউরের নাম সুপারিশ করেছিলেন। শেখ হাসিনা তখন আর শর্ট লিস্টের দিকে চোখ না বুলিয়ে মুহিতের কথায় আতিউরকেই নিয়োগ দিয়েছিলেন। আতিউর তখন নেপালে সফর করছিলেন।সে কারণে এ বিষয়ে পুরো অবগত ছিলেননা। বিখ্যাত অর্থনীতিবিদদের টপকে কেমন করে আতিউর শেখ হাসিনার গুড লিস্টে চলে আসলেন। মুহিত কিন্তু বিগত সাত/আট বছরে একবারের জন্যে হলেও আতিউরকে কিংবা কারো কাছে এ বিষয়ে মুখ খুলেননি। মুহিতের স্বভাবটাই এমন। সব সময় ভালোকে ভালো বলাটাই স্বভাব। সেজন্যে ঢাক ঢোল পেটাতে চাননা। আতিউর সার্কেলের লোকজন কখনো সেকথা না জেনেও প্রাইম মিনিস্টারের বদান্যতার কথা বলে কান ভারি করেছেন, আর অর্থমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আতিউরকে নিয়ে গিয়ে সরাসরি প্রাইম মিনিস্টারের লোক প্রচারের একটা ইগু সুরু থেকে সূক্ষ্মভাবে করে ফায়দা হাসিল করতে চেয়েছেন। আতিউর এর সেই কায়েমি সার্কেল তাতে সফলও হয়েছেন। হলমার্ক, ডেস্টিনি, শেয়ার বাজার থেকে শুরু করে হালের বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি- সব কিছুতেই সেই কায়েমি সার্কেলের হাত জড়িত। যারা সব সময়ই সকল সরকারের আমলে থেকেছেন ধরা ছোয়ার বাইরে। আর নিজের নাম ও সম্মানের ধোয়াই দিয়ে আতিউররা সেসব জেনেও না জানার ভান করেছেন- সেটা এখন ওপেন সিক্রেট।

অর্থমন্ত্রী কখনোও আতিউরের বিরুদ্ধে কিছু করেননি বা কান কথা বলেননি কিংবা লাগাননি, কেউ প্রমাণ দেখাতে পারবেননা। যা কিছু তিনি বলেছেন প্রকাশ্যে- কোন রাখ ঢাক না রেখেই। তিনি কখনো ভাবেননি, এমন সরাসরি কথায় এতে তার নিজেরও ইমেজের কিংবা চাকুরী জীবনের তার দীর্ঘ সফলতায়, এমনকি বাংলাদেশের অর্থনীতি শক্ত ভিত্তির উপর দাড় করানোর কৃতিত্বে ভাটা পড়তে পারে। অন্যদের মতো কিংবা আতিউর, বারাকাত, বা আওয়ামীলীগের ধান্দাবাজ নেতাদের মতো হলে, ইনিয়ে বিনিয়ে দক্ষ আমলার মতোই বলতেন অথবা বিশ্বব্যাংকের এককালীন ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনকারী কর্পোরেট আমলা বসদের মতোই কথা বার্তা বলতেন, যা অর্থমন্ত্রীর ক্লিন ইমেজে কেউ আঁচ দিতে পারতোনা। কিন্তু তিনি সে সব না করে সোজা সাপ্টা বক্তব্য প্রকাশ্যে বলে দেন। আর আমাদের সহজ স্বভাবজাত বাঙালি সেন্টিম্যান্ট যায় অর্থমন্ত্রীর বিরুদ্ধে।

আতিউর দায়িত্ব নেয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক সংস্কার থেকে শুরু করে শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, হলমার্ক, ডেস্টিনির কেলেঙ্কারির বিষয়ে অর্থমন্ত্রী যখন আতিউরকে ব্যবস্থা নিতে বলেন, তখন আতিউর বোধগম্য কারণে অর্থমন্ত্রীর নির্দেশ উপেক্ষা করে শক্তিশালী আমলা গ্রুপ আর সেই কায়েমী বিজনেস সিন্ডিকেটের স্বার্থ রক্ষা করে একের পর এক পদক্ষেপ নিয়েছেন এককভাবে। অর্থমন্ত্রীকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন। নেহায়েত ভদ্র আর হার্ভার্ড আর ক্যামব্রিজ থেকে উচ্চ শিক্ষিত আর ক্যারিয়ার জীবনের গোল্ড ম্যাডালিস্ট মুহিত আতিউরের এমন ব্যবহারে দুঃখ না পেয়ে বরং স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিয়েছেন, বাধা হয়ে দাড়াননি। সাইফুর রহমান এই জায়গায় হলে আতিউরকে ডেকে এনে সাক্ষাত বিদায় করে দিতেন- কথা না শুনার জন্য। অথচ মুহিত আতিউরের সাথে সেরকম কোন কিছু না করেই বরং আরো স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিয়েছেন। আতিউরের সামনের ব্যবহারে মুহিত ধারণাই করতে পারেননি, সব কেলেংকারির হোতারা আতিউরকে এতো পছন্দ করে কেন ? যখন জানলেন, তখন অনেক দেরী হয়ে গেছে।

আতিউর শুধু কেলেংকারি আর চোর বাটপারদের রক্ষা কবচই দেননি, নিজে দায়িত্ব নেয়ার পর বিদেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন বক্তৃতা দেয়ার জন্য। আতিউরের সেই সব সফরের খরচ আবার অধীনস্ত প্রাইভেট ব্যাংকারদের বাধ্য করেছেন দিতে। এখানেই নয়, অধস্থন কর্মকর্তাদের আতিউর ব্যতিব্যস্ত রাখতেন নিজের তোষামোদি প্রচার আর বিদেশ সফরের নামা বা সূচী তৈরিতে।তাকে যাতে আমন্ত্রন জানানো হয়, সেজন্য রীতিমতো অধীনস্থ কর্মকর্তা আর ব্যাংকারদের ব্যস্ত রাখতেন লবিষ্টের কাজে। এই সব করতে বা করাতে গিয়ে আতিউর বাংলাদেশ ব্যাংকের পুরো চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে ফেলেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীচ তলাকে তিনি এক ফড়িয়া বাজারে পরিণত করেন। একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এমন বাজার পৃথিবীর কোথাও নেই। এমনকি একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্ণর বা বস কখনো এমন করে বিশ্বব্যাপী অধীনস্থ ব্যাংকের এমডিদের টাকায় বক্তৃতা দিয়ে বেড়ানোর নজিরও নেই।আতিউর নিজের বক্তৃতা আর ফিরিস্তি ও শেখ হাসিনার প্যারালাল হিসেবে নিজের ভীসন প্রচার করতে গিয়ে বরং দুর্নীতি আর কেলেংকারীকেই উস্কে দিয়েছেন।তিনি চাকরী জীবনের বিধিমালা ভঙ্গ করেছেন বারে বার, নৈতিকতার দোহাই দিয়ে আর্থিক খাতে এক ধরনের ফড়িয়া আর ফটকাবাজদের কবলে ছেড়ে দিয়েছেন- যা একেবারেই অনুচিত এবং অন্যায় কাজ হয়েছে। যারা আতিউরের এই বিশাল খরচ জুগিয়েছেন, তারা চাইছেন দান মেরে সুদে আসলে উঠিয়ে নিতে। সুতরাং যা হবার তাই হয়েছে।

রিজার্ভ যখন চুরি হয়- আতিউর এক মাসের মতো সেটা গোপন রেখেছেন। তার পর বিদেশও সফর করেছেন দিব্যি। এই সময়ের মধ্যে রিজার্ভের টাকা ফিলিপাইন্স থেকে ডেড-একাউন্টে চলে যাওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত হতে সব কিছুই গোপণ থাকে- এতে তিনি কাদের স্বার্থ রক্ষা করেছেন?অর্থমন্ত্রীকে জানানোর দরকার নেই- ঠিক আছে, কিন্তু এতো ক্ষমতা আর স্বাধীনতার অধিকারি আতিউর রিজার্ভের টাকা চুরি রক্ষার ব্যাপারে কি পদক্ষেপ নিলেন- মাস খানের মধ্যে সেটাও দৃশ্যমান নয়, যেভাবে দৃশ্যমান তার বিদেশ সফর আর সুন্দর শব্দ চয়নে প্রেসের সামনে ব্যাখ্যা।

চোরকে চুরি করতে দিলেন, আবার সাউধকে বললেন, আমিতো আপনাকে জানিয়েছি (প্রাইম মিনিস্টারকে জানিয়েছেন বলেছেন)- এমন আপ্ত বাক্য আমরা পড়েছি বই পুস্তকে। আতিউরের কর্মকান্ড না দেখলে এর সফল প্রয়োগ হয়তো বুঝে উঠতে যুগের পর যুগই চলে যেতো।

যে প্রবাসী নিজের শরীরের ঘাম ফেলে দেশে সঞ্চয় করছে, যে গার্মেন্টস শ্রমিক তার রক্ত পানি করে দেশের অর্থিক খাতে গতি সঞ্চার করছে- বিগত কয়েক বছরের মধ্যে একবারও আতিউর রোড শো, দশ টাকা একাউন্ট কতো ম্যাজিক শো করলেন, কতো সেমিনারে বক্তব্য দিলেন, কিন্তু রিজার্ভের প্রাণ, সিংহভাগ দাবীদার প্রবাসী আর গার্মেন্টস শ্রমিকদের কথা একবারের জন্যও উচ্চারণ করলেননা- অথচ নিজের কৃতিত্ব ঠিকই প্রচার করেছেন।এই আমাদের শিক্ষক আর কর্তা ব্যক্তিদের শ্রেণী চরিত্রের আদর্শ বহিঃপ্রকাশ।

আজ বোধগম্য কারণে তাই সেই সব চোর বাটপার, কেলেংকারির হোতারা, আর লুটেরা এবং যে মন্ত্রী, সাংসদ মুহিতের দরজা থেকে বার বার ফিরে গেছেন, মুহিত কখনো কারো সুপারিশে অবৈধ কাজে সাইন করেননি, কখনো ধমক দিয়ে বের করে দিয়েছিলেন, সেই সব এমপি, মন্ত্রী, লুটেরার নায়করা আর তথাকথিত বুদ্ধিজীবী- যারা সব সময় ফটকাবাজ, ফড়িয়াবাজ আর ধান্দাবাজ আর লুটেরাদের স্বার্থ রক্ষা করে, লুটেরাদের টাকায় জীবন চালায়, সেমিনার বক্তৃতা দেয়- তারা সব এক হয়েছে মুহিতকে কোনভাবে বিদায় করে দিতে। কারণ তারা জানে, একটু প্রপাগান্ডা করলেই মুহিত যে স্বভাবের মানুষ বিদায় হয়ে যাবেন আপনা থেকেই। মুহিতই একমাত্র মন্ত্রী যিনি স্বেচ্ছায় অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রীর পদ থেকে বনিবনা না হওয়ায় পদত্যাগ করে ইউএনডিপিতে চলে গিয়েছিলেন। আজ যারা বলছে, মন্ত্রীত্বের লোভে তিনি আকড়ে ধরে আছেন- তারা না জেনে কিংবা নিতান্ত জেলাসের বশবর্তী হয়েই করছেন। 

আমাদের সমাজে এখন যে যতো চুরি বাটপারি করতে পারে- সে ততো বড় লোক আর সে ততো বড় এনাম পায়। বলা যায়না এই আতিউর কিংবা বারাকাত আর্থিকখাতের এতো বড় ধবস ও কেলেংকারিতে জড়িত থাকা সত্যেও অর্থমন্ত্রনালয়ের বস হিসেবেও আবির্ভুত হতে পারে। হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদ যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তখন নিজের সার্কেলে একটা কথাই বলতেন, সব সম্ভবের দেশ বাংলাদেশ।

কিন্তু বাংলাদেশের অগণিত নিরন্ন মানুষের স্বার্থে- বিশেষ করে এই লুটের রাজত্বে অন্তত একজন বৃদ্ধ ন্যায়পালও দরকার, হউক তিনি বয়োবৃদ্ধ, কিন্তু কর্মে আর উদ্দীপনায় এবং শতভাগ সততার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এমন কালোত্তীর্ণ এই কালের নায়কের অর্থমন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে টিকে থাকা দরকার- সেজন্য শেখ হাসিনার সরকারের ভিতরে ও বাইরে ( দেশে বিদেশে) এবং একই আর্থিক খাত সুদৃঢ় রাখার জন্য এই একজন আবুল মালকে আরো অনেকদিন শেখ হাসিনার সরকারের সঙ্গী রাখা প্রয়োজন- যে যতো কথাই বলুক, কারণ এই সব মুনাফালোভী, অতি লোভী, গরীবের ধন সম্পদ লুন্ঠঙ্কারীদের হাত থেকে টাকশাল আর দেশের আর্থিক খাতকে কিছুটা হলেও নিরবচ্ছিন্ন আর নিরাপদ রাখার জন্য এই রকম কাজ পাগলা আর রাবিশ খবিস বলার মতো দুর্দমনীয় সাহসী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের  দরকার। অন্ততঃ শেখ হাসিনার হাতকে মজবুত রাখার জন্যে হলেও। আশা করি হাসিনার সরকার  অন্তত আর্থিক খাতকে লুটেরাদের হাতে অবাধে ফ্রি স্টাইলে না দেয়ার জন্যে মুহিতকে যেতে দেবেননা

২১/০৩/২০১৬

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here