প্রচ্ছদ স্বাস্থ্য ফ্যাটি লিভার কেন হয়, কী করবেন!

ফ্যাটি লিভার কেন হয়, কী করবেন!

362
0
আধুনিক শহুরে জীবনে খাওয়া-দাওয়ার অনিয়মের কারণে আজকাল অনেকেই ‘ফ্যাটি লিভারে’ আক্রান্ত হচ্ছেন। অনেকে এ রোগে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি নিয়েই জীবন যাপন করছেন। অতিরিক্ত মদ্যপান ও খাওয়া-দাওয়ায় অনিয়ম ফ্যাটি লিভারের অন্যতম প্রধান কারণ। আবার ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত হবার পর যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না-করা হলে, লিভার ক্যান্সার হবার আশঙ্কা বাড়ে। সুতরাং, প্রথম কর্তব্য হচ্ছে এ রোগ প্রতিরোধে সম্ভাব্য সবকিছু করা এবং দ্বিতীয়ত, যদি কেউ এ রোগে আক্রান্ত হয়, তবে তার যথাযথ চিকিত্সা করতে হবে। সম্প্রতি স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইটে এ সম্পর্কে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
আমরা যাকে ‘যকৃত’ বলি, ইংরেজিতে সেটাকেই বলে লিভার (Liver)। এটি সাধারণত মেরুদণ্ডী প্রাণীদেহে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এটি প্রাণীদেহের বিপাকে ও অন্যান্য কিছু শারীরিক কাজে প্রধান ভূমিকা পালন করে। গ্লাইকোজেনের সঞ্চয়, প্লাজমা প্রোটিন সংশ্লেষণ, ওষুধ বা অন্যান্য রাসায়নিক নির্বিষকরণে এর ভূমিকা অপরিহার্য। যকৃত বা লিভার দেহের বৃহত্তম গ্রন্থি। এটি মধ্যচ্ছদার নিচের অংশে অবস্থিত। যকৃতে পিত্ত উত্পন্ন হয়। পিত্ত একধরনের ক্ষারীয় যৌগ যা পরিপাকে সহায়তা করে, বিশেষত স্নেহজাতীয় খাদ্যের ইমালসিফিকেশন। এছাড়াও যকৃত দেহের আরও বিভিন্ন জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। যকৃত. ২টি খন্ডে বিভক্ত–ডান এবং বাম।
এবার আসুন জেনে নিই ‘ফ্যাটি লিভার’ রোগ সম্পর্কে। লিভারের ওজনের পাঁচ থেকে দশ ভাগের বেশি চর্বি দিয়ে পূরণ হলে যে রোগটি হয় তাকে ‘ফ্যাটি লিভার’ বলে। পশ্চিমা বিশ্বে সাধারণত মদ্যপানের কারণে ফ্যাটি লিভার হয়ে থাকে। তবে বহুমূত্র, শর্করা জাতীয় খাদ্যের আধিক্য, রক্তে চর্বির আধিক্য, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা ইত্যাদি কারণে ‘ফ্যাটি লিভার’ হতে পারে। লিভারে জমা চর্বি অনেক সময় স্থানীয় প্রদাহ সৃষ্টি করে এবং এ প্রদাহ থেকে কিছুসংখ্যক রোগীর লিভার সিরোসিস, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে লিভার ক্যান্সারও হতে পারে। প্রাথমিক অবস্থায় এই রোগের কোনো উপসর্গ থাকে না, অন্য রোগের পরীক্ষা করার সময় সাধারণত রোগটি ধরা পড়ে। কখনো কখনো পেটের উপরিভাগের ডানদিকে ব্যাথা, অবসন্নতা, ক্ষুধামান্দ্য ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
মানুষ কেন ‘ফ্যাটি লিভারে’ আক্রান্ত হয়? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণত ৫টি কারণে একজন মানুষ ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত হতে পারে।
কারণ এক : অতিরিক্ত পুষ্টিকর খাবার খাওয়া
অতিরিক্ত পুষ্টিকর খাবার খেলে ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত হবার আশঙ্কা থাকে। তাই এ রোগ প্রতিরোধে পরিমিত খাবার খাওয়া প্রয়োজন। তবে, অনেকে ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত হবার ভয়ে প্রয়োজনের তুলনায় কম খাবার খান। এটা ঠিক নয়।
কারণ দুই : হাইপারলিপিডেমিয়া
হাইপারলিপিডেমিয়া বা রক্তে উচ্চ কলেস্টেরল। যেসব খাবার খেলে রক্তের কলেস্টরেল বাড়ে, সেসব খাবার লিভারের ওপর চাপ ফেলে। পরিণামে লিভারে চর্বি জমে এবং ফ্যাটি লিভারের লক্ষণ দেখা দেয়।
কারণ তিন : স্থূলতা
স্থূলতা বা মুটিয়ে যাওয়া বহু রোগের কারণ। নিঃসন্দেহে ফ্যাটি লিভারের সাথে স্থূলতার সম্পর্ক আছে। এক জরিপ থেকে জানা গেছে, যারা মোটা মানুষ, তাদের মধ্যে অর্ধেকের বেশির ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কারণ চার : মদ্যপান
মদ্যপানকে বহু রোগের কারণ হিসেবে গণ্য করা হয়। অতিরিক্ত মদ্যপান করলে ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত হবার আশঙ্কা বাড়ে।
কারণ ছয় : ডায়াবিটিস
ডায়াবিটিসে আক্রান্তদের অর্ধেকের বেশি ফ্যাটি লিভারের রোগী। কারণ, তাদের শরীর গ্লুকোজ ও ফ্যাটি অ্যাসিড সুষ্ঠুভাবে পোষণ করতে পারে না। এগুলোর খানিকটা লিভারে চর্বি হিসেবে জমা হয় এবং অবশেষে তারা ফ্যাটি লিভার রোগে আক্রান্ত হন।
এখন এই রোগে আক্রান্তদের জন্য বিশেষজ্ঞের চারটি পরামর্শ নিয়ে আলোচনা করবো।
পরামর্শ এক : খাওয়া-দাওয়া নিয়ন্ত্রণ করুন
খাওয়া-দাওয়ার ক্ষেত্রে পরিমিতিবোধ থাকতে হবে। নিত্যদিনের খাবার তালিকায় পুষ্টিকর খাবার অবশ্যই থাকবে, তবে তা হবে পরিমিত। অনেকে অতিরিক্ত পুষ্টিকর খাবার খান এবং ভাবেন তার শরীর ভালো থাকবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, অতিরিক্ত কোনোকিছুই ভালো নয়। সবচে ভালো হয়, আপনার শরীরের চাহিদা অনুসারে প্রতিদিন কতোটুকু খাবার কী পরিমাণে খাওয়া উচিত, তা কোনো পুষ্টিবিদের কাছ থেকে জেনে নেওয়া।
পরামর্শ দুই : ধূমপান ও মদ্যপান থেকে বিরত থাকুন
মুসলমানরা ধর্মীয় বিধিনিষেধের কারণে মদ্যপান করেন না। কিন্তু অনেক মুসলমান ধূমপান করেন। অথচ ধূমপান শরীরের জন্য কোনো কল্যাণ বয়ে আনে না। বরং এটি শরীরের বহু রোগের কারণ। ফ্যাটি লিভারের রুগীর উচিত ধূমপান থেকে শত হাত দূরে থাকা। আর মদ্যপান তো ফ্যাটি লিভারের রুগীর জন্য মারাত্মক। আগেই বলেছি, অতিরিক্ত মদ্যপান একজন সুস্থ মানুষকেও ফ্যাটি লিভারের রুগী বানিয়ে দিতে পারে।
পরামর্শ তিন : অতিরিক্ত উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা এড়িয়ে চলুন
জীবন চলার পথে আমরা প্রতিনিয়ত নানা কারণে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠায় ভুগি। এটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু অতিরিক্ত উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। বিশেষ করে ফ্যাটি লিভারের রুগীদের জন্য এটা মারাত্মক। তাই উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা এড়িয়ে চলুন। দুশ্চিন্তা বা উত্কণ্ঠিত হয়ে কোনো লাভ নেই, ক্ষতি আছে। তাই জীবনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করুন। যা ঘটে গেছে তা নিয়ে উদ্বেগাকূল না-হয়ে ভবিষ্যতের কথা ভাবুন। আর এই ভাবার কাজটি করতে গিয়ে অযথা টেনশান করবেন না। মনে রাখবেন, চিন্তা আর দুশ্চিন্তার মধ্যে বিস্তর ফারাক। চিন্তা মানুষকে সামনে এগিয়ে দেয়, আর দুশ্চিন্তা টানে পেছনের দিকে। অতএব উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা-দুশ্চিন্তাকে ‘না’ বলুন।
পরামর্শ চার : ওজন কমান
আপনার শরীরের ওজন কি ঠিক আছে? মানে, আপনার বয়স ও উচ্চতার তুলনায় ওজন ঠিক আছে কি? মনে রাখতে হবে, অতিরিক্ত ওজন উচ্চরক্তচাপ ও ডায়াবিটিসসহ নানা ধরণের রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ায়। সুতরাং, ওজন কমানোর চেষ্টা করুন, সুস্থ থাকুন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here