প্রচ্ছদ সফল নারী পুরুষের তুলনায় কম নয় নারীর বেতন : ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা

পুরুষের তুলনায় কম নয় নারীর বেতন : ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা

70
0
মো: আবদুস সালিম: সারা বিশ্বে পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি কাজ করেন নারীরা। এর বেশির ভাগই অবৈতনিক। অর্থাৎ বিনা বেতনে বা বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করেন তারা। নারীরা চাকরি করলেও বেশির ভাগ সময় পুরুষের তুলনায় কম বেতন পান। যেমন কম বেতন বা পারিশ্রমিক পায় শিশুরা। এ ক্ষেত্রে নারীদের উদ্দেশে বলা হয়েছে, আপনারা কখনোই পুরুষ সহকর্মীর তুলনায় কম বেতন বা পারিশ্রমিক নেবেন না। তবে এ ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, নারীদের হতে হবে পুরুষের মতোই সক্ষম ও আত্মবিশ্বাসী।
বিশ্বের নারীদের উদ্দেশে সম্প্রতি এমন সাম্য বা সমতামূলক গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা। তার পুরো নাম ক্রিস্টালিনা ইভানোয়া জর্জিয়েভা কিনোভা। ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা এখন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের প্রধান (ব্যবস্থাপনা পরিচালক)। গত ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯ বোর্ড বৈঠকে এমডি হিসেবে নিশ্চিত হয় তার এসংক্রান্ত মনোনয়ন। তার মানে ক্রিস্টালিনাই এখন বিশ্বের উদীয়মান অর্থনৈতিক দেশগুলো থেকে বৈশ্বিক এ সংস্থার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সবচেয়ে বেশি ভোটিং পাওয়ার রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। আর পরবর্তী বা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতার মালিক ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ইইউর। যুক্তরাষ্ট্র কোনো প্রার্থী দেয়নি ইইউর দেয়া এ প্রার্থীর বিপক্ষে; বরং শক্ত বা মৌন সমর্থন দেয়া হয়েছে জর্জিয়েভাকেই। আর এ কারণেই তিনি এখন আইএমএফের প্রধান। তার মনোনয়নের আগে আইএমএফ বোর্ডের কর্মকর্তারা বলেছিলেন, এ মুহূর্তে বহুজাতিক এ প্রতিষ্ঠানটিকে নেতৃত্ব দানের জন্য জর্জিয়েভাই যোগ্য। গত প্রায় ৭৫ বছরের ঐতিহ্য বলছে, আইএমএফের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে ইউরোপীয়রাই। এবারো ঘটছে না এর ব্যত্যয় বা ব্যতিক্রম। ক্রিস্টিন লাগার্দের পরে সংস্থাটির প্রধান হিসেবে দ্বিতীয় পরিচয় মেলে ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভার। তার মেয়াদ শুরু হয় ১ অক্টোবর ২০১৯-এ। এর মেয়াদ পাঁচ বছর।
ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভার জন্ম বুলগেরিয়ার রাজধানী এবং বৃহত্তর শহর সোফিয়ায় ১৯৫৩ সালের ১৩ আগস্ট। মূলত তিনি বিশ্বে অর্থনীতিবিদ হিসেবেই বেশি পরিচিত। এত ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি ভ্রমণ, নাচ, গিটার বাজানো, দেশী-বিদেশী নানা মুখরোচক খাবার রান্না ইত্যাদি সৃজনশীল বিষয়েও কমবেশি সময় ব্যয় করেন। তিনি বলেন, এসব সৃজনশীল কাজ পেশাগত কাজে উৎসাহ বাড়ায়।
জর্জিয়েভা প্রধান নির্বাহী হিসেবে কর্মরত ছিলেন জানুয়ারি ২০১৭ থেকে ১ অক্টোবর ২০১৯ পর্যন্ত। পেশাগত দায়িত্বে থেকে তিনি সব সময় ভাবেন কিভাবে বা কোন পদ্ধতিতে বিশ্ব অর্থনীতিকে ভালো বা চাঙা রাখা যায়। তবে এ জন্য ব্যাপক প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। আইএমএফ এমডি বলেছেন, ক্রামগত মন্থর হয়ে পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতি। ২০০৫ ও ২০০৬ সালের দিকেও খুবই খারাপ অবস্থায় চলে এসেছিল বৈশ্বিক অর্থনীতি। তখন প্রায় সব ধরনের জিনিস, বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যায় অস্বাভাবিক হারে। বর্তমানে এ ক্ষেত্রে যখন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা খুব বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে, তখন এ বিষয়ে ক্রমেই কমে যাচ্ছে কিছু দেশের সদিচ্ছা; যা রীতিমতো উদ্বেগজনক। ফলে ক্রমাগত স্থবিরতার দিকে এগোচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতি। এর পরিণতিতে ২০১৯ সালেই প্রায় ৯০ শতাংশ কমবে বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি।
তিনি আরো বলেন, সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বৃহৎ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। বৈশ্বিক অর্থনীতি যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে ২০১৯ সালে প্রবৃদ্ধি কমে নেমে যেতে পারে গত এক দশকের প্রায় সর্বনিম্ন পর্যায়ে। বিশ্ব অর্থনৈতির পূর্বাভাস (ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক) হলো, অর্থনৈতিক ক্রমমন্থরতা থাকবে ২০১৯ ও ২০২০ সালে; যদিও ২০২০ সাল আসতে খুব বেশি দেরি নেই। জর্জিয়েভার মতে, স্থবিরতার ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হ্রাস পাবে বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ দেশে। প্রবৃদ্ধি কমে যাবে সার্বিকভাবে। বলা হয়েছে, ৫ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি আসতে পারে প্রায় ৪০টি উন্নয়নশীল দেশে। তন্মধ্যে রয়েছে প্রায় ১৯টি সাব-সাহারান আফ্রিকান দেশ। এখন সর্বনিম্ন বেকারত্ব চলছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানিতে। ক্রমেই নেমে গেছে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান মিলিয়ে উন্নত রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক কার্যক্রম। চলতি বছর প্রবৃদ্ধি এর আগের প্রাক্কলনের তুলনায় নেমে যাবে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর অর্থনীতিতে।
এ দিকে, উচ্চ হারে প্রবৃদ্ধি করে আসছিল চীন এবং তা অনেক বছর ধরে ছিল। সেই ধারাবাহিকতায়ও ছেদ পড়েছে। এমনকি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি রয়েছে আইএমএফের কর্মসূচি, এমন রাষ্ট্রগুলোর অর্থনীতিতেও চলছে সঙ্কট। কঠিন এ সঙ্কটকালে ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভার পরামর্শ হলো, আর্থিক স্থিতিশীলতা ও সঠিক বা যথাযথ মুদ্রানীতি অনুসরণ করা দরকার সব রাষ্ট্রকে।
জর্জিয়েভা প্রধান নির্বাহী বা সিইও হিসেবে বিশ্বব্যাংকে নিরলস পরিশ্রম করেন জানুয়ারি ২০১৭ থেকে ১ অক্টোবর ২০১৯ পর্যন্ত। আর বিশ্বব্যাংকের গ্রুপের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ২০১৯-এর ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ৪ এপ্রিল ২০১৯ পর্যন্ত। অবশ্য এর আগে দায়িত্ব পালন করেন ইউরোপীয় কমিশনসহ সভাপতি হিসেবে। ২০০৮ সালে করপোরেট সচিব হন তিনি। এমনকি ট্রাস্টি বোর্ডেরও সদস্য। বুলগেরিয়ার জাতীয় ও বিশ্ব অর্থনীতি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে সম্মানের সাথে অধ্যাপক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ২ সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে জর্জিয়েভাকে জাতিসঙ্ঘের সেক্রেটারি জেনারেল পদ দেয়া হয়। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, একটি উদীয়মান দেশের প্রতিনিধি হয়ে উন্নয়নমূলক অনেক কাজই সফলতার সাথে সম্পন্ন করেন তিনি।
ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা রাজনৈতিক অর্থনীতি ও সমাজ বিজ্ঞানে এম এ করেন সোফিয়ায় কার্ল মার্কস ইনস্টিটিউট থেকে। এখন এ প্রতিষ্ঠানটিকে বলা হয় বিশ্ব অর্থনীতি বিশ্ববিদ্যালয়। পিএইচডি করেন অর্থনীতিতে। শিক্ষা জীবনে তার থিসিসের নাম ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পরিবেশ সংরক্ষণ নীতি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি।’ স্নাতকোত্তর গবেষণা করেছেন ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে অর্থনীতি ও পরিবেশ নীতি বিষয়ে। লিখেছেন ১০০-এর বেশি একাডেমিক গবেষণাপত্র। মাইক্রো অর্থনীতি বিষয়ে বইও লিখেছেন। তিনি অধিষ্ঠিত ছিলেন বুলগেরিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি একাডেমিক এবং পরামর্শমূলক পদে। উন্নয়নমূলক বক্তৃতা দেন অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালগুলো হলো অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়, ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স ইত্যাদি। শ্রোতা-দর্শকরা মনোযোগ দিয়ে তার বক্তৃতা শোনেন। কারণ, জর্জিয়েভা ইংরেজি, বুলগেরিয়ান, রাশিয়ান, ফরাসি প্রভৃতি ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলতে পারেন। এজন্য অনেকে তাকে ‘ভাষাবিদ’ও বলে থাকেন।
জর্জিয়েভা ১৯৯৩ সালে তার কেরিয়ার শুরু করেন ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গ্রুপে ইউরোপ এবং মধ্য এশিয়ার পরিবেশগত অর্থনীতিবিদ হিসেবে। তারই ধারাবাহিকতায় ব্যাংকের নানা পদে পরিবেশ কৌশল, নীতি ও ঋণদানের দায়িত্ব পান। এমনকি একটি পর্যায়ে পরিবেশ বিভাগের পরিচালক হন। রাশিয়ান ফেডারেশনের (মস্কোভিত্তিক) পরিচালক এবং আবাসিক প্রতনিধি হন ২০০৪ থেকে। একপর্যায়ে টেকসই উন্নয়ন ও কৌশল এবং অপারেশনসের পরিচালক হয়ে ওয়াশিংটন ডিসিতে ফিরে আসেন।
তিনি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, মানবিক সহায়তা প্রভৃতি জনহিতকর কাজ নিয়ে প্রচুর ব্যস্ত থাকেন। যে কারণে তিনি পান বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম মানবিক সহায়তা বাজেট পরিচালনার দায়িত্ব। তিন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের ব্যাপারেও নিরলস কাছ করে গেছেন। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক নানা সঙ্কট ও বিপর্যয়ের ওপর। তিনি কয়েক গুণ তহবিল বাড়ান ইউরোপের শরণার্থী সঙ্কটের প্রাক্কালে। নগদ সহায়তা দেন শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত লোকদের জন্য। সামাজিক সংস্কারের প্রতিও মনোযোগ বাড়ান। একপর্যায়ে প্রধান প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে।
২০১০ সালের হাইতির স্মরণকালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে মানবিক পরিণতি বিষয়ে ইইউর প্রতিক্রিয়া সমন্বয়ের ব্যাপারে কাজ করেন। পাকিস্তানের ভয়াবহ বন্যা, চিলির ভূমিকম্পসহ বিশ্বের নানা সঙ্কট ও বিপর্যয়ের বিষয়ে নিশ্চিত করেন ইইউর অনকূল প্রতিক্রিয়া। খাদ্য সঙ্কট প্রশমনের প্রতিও গুরুত্ব দেন। এমনকি মনুষ্যসৃষ্ট কিছু সমস্যা নিরসনের জন্যও প্রচুর সময় দেন। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে সাহায্যের পরিমাণও বাড়িয়ে দেন। জর্জিয়েভা নেতৃত্ব দেন ‘ইইউ চিলড্রেন অব পিস’ উদ্যোগের। জরুরি অবস্থায় মনোযোগ বাড়ান শিক্ষাব্যবস্থা খাতে। তিনি ২০২০ সাল নাগাদ বিশ্বব্যাংকের উচ্চতর ব্যবস্থাপনা পদের প্রায় ৫০ শতাংশ নারীদের দখলের লক্ষ্যে (জেন্ডার সমতার) গুরুত্ব বাড়ান, যা অর্জিত হয় অক্টোবর ২০১৮ সালের আগেই। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, জর্জিয়েভা রীতিমতো নানা সংস্কারের স্থপতি।
জর্জিয়েভা বলেন, বৈশ্বিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে হলে বেসরকারি খাতেও অধিক অর্থায়ন বেশ জরুরি। নানা জনহিতকর ও উন্নয়নমূলক কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ‘ইউরোপিয়ানস অব দ্য ইয়ার ২০১০’ পুরস্কারে ভূষিত হন। এমনকি কমিশনার অব দ্য ইয়ারও মনোনীত হন। এর নাম দেয়া হয়েছিল ‘ইউরোপীয় বছর’। ২০১৭ সালের বহুজাতিক সংস্থার ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তালিকায় স্থান পান জর্জিয়েভা। উদীয়মান ইউরোপের ‘মেরিনা স্টুরডজা’ পুরস্কারে ভূষিত হন ২০১৯ সালে। মেরিনা নিকোল স্টুরডজা হচ্ছেন, জনৈক প্রাক্তন রোমানিয়ান রাজকন্যা। তিনি ছিলেন মানবতাবাদী কর্মীও। একই বছর পান বৈদেশিক নীতি সমিতির পদক। এটি একটি অলাভজনক সংস্থা, যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯১৮ সালে; যারা আন্তর্জাতিকতাবাদে নানাভাবে দায়বদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ে মানুষের জ্ঞানকে প্রসারিত করে, তারাই এমন ধরনের পদক পেয়ে থাকেন। জর্জিয়েভা ২০১২ সালে চীন কাউন্সিল ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন অন এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বা সিসিআইইসিইডি-এর সম্মানিত সদস্য ছিলেন। এমনকি ইউরোপীয় কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশন্স বা ইসিএফআর-এর সদস্য। ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা এসংক্রান্ত আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে বিশ্বে আর্থসামাজিক উন্নতির জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।