প্রচ্ছদ প্রবন্ধ না Vs. নারী

না Vs. নারী

1281
0

-হুমায়রা নাজিব

নারীর ক্ষমতায়ন, নারী শক্তি কিংবা নারীর অধিকার, শব্দগুলোর সাথে পরিচিতি বোধহয় আমাদের খুব বেশিদিনের নয়; এই শব্দগুলো উৎপত্তির বহুকাল আগেই নারীকে ক্ষমতা বা শক্তির প্রতিক হিসেবে আমরা দেখেছি বহুবার বহুরূপে; মায়ের পায়ের নিচে জান্নাত, সেই মায়ের যে অধিকার আমরা জেনেছি, তেমনি দশভূজা দেবি দূগর্ার সাথেও আমাদের পরিচয় বহুকাল আগের; নারীর ক্ষমতা বা নারীশক্তির বিষয়টাকে ইদানিংকালে খুব বেশি ফোকাসে আনা হলেও মোটামুটিভাবে সৃষ্টির অনেক আগে থেকেই ইচ্ছাকৃত হোক আর  অজ্ঞাতসারেই হোক, স্বীকার করে নেয়া হয়েছে নারীর শক্তিকে; একজন নারীকে তাঁর জন্মলগ্ন থেকে শুরূ করে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বিভিন্ন ভুমিকা পালনের মধ্যে দিয়ে সংসারে অবদান রাখতে হয় ; কন্যা, বধূ, মা, শাশুড়িমা কিংবা দাদিমা, প্রতিটা ভূমিকা নারীর এক অঙ্গে বহুরূপেরই প্রকাশ; একজন নারী থাকতে পারে সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত সফল ব্যক্তিত্ব, আবার থাকতে পারে আঁধারে বন্দীনি গৃহকোণঠাসা অতি সাধারণ কোন রমণীর ভূমিকায়। একজন সফল নারীর সফলতার পেছনে যেমন একটি গল্প আছে, তেমনি যে রমণী হাঁড়ি ঠেলেই কাটিয়ে দিয়েছে জীবন, তাঁর এই জীবনেও অন্য কোন গল্প আছে; মূলত জন্ম থেকেই শুরু হয় নারীর পথ চলার এই গল্প। কোন নারী হয়ত তাঁর সেই গল্পকে তুলে ধরার সুযোগ পায় সকলের সামনে, আবার কেও আছে যারা তাদের গল্পকে বুকের মধ্যে লালন করেই কাটিয়ে দেয় তাদের সমস্ত জীবন। তাদের না বলা গল্প জানতে পায়না সমাজ সংসারের মানুষ । এমনকি কখনো খুব কাছের মানুষও জানতে পায়না সেই গল্প; কারোর হয়তো আবার এমন কেও নেই যার কাছে মনের কথাগুলো ব্যক্ত করবে সে। তবে সফল অথবা সাধারন, স্বনির্ভর কিংবা নির্ভরশীল, যে ধরনের নারীর গল্পেই আমরা যাইনা কেন, প্রতিটি গল্পেই ‘না’ শব্দটার একজন নারীকে বারবার মোকাবেলা করতে হয়; ‘নারী’ শব্দটির শুরু ‘না’ দিয়ে হলেও জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে এই ‘না’ কে জয় করেই এগিয়ে চলতে হয়েছে নারীকে। একটা  ছেলের জন্মের পরে বাবা মা তাঁকে নিয়ে যতখানি উদ্বিগ্ন থাকেন, মেয়ে শিশুটির নিরাপত্তাজনিত কারনেই বাবা-মার উদ্বিগ্নতা থাকে অনেক বেশি ; আমাদের সমাজ ব্যবস্থাটাই এমন যেন মেয়েরা জন্মাবার পর থেকেই অরক্ষণীয়া। এই অরক্ষণীয়াকে রক্ষা করবার চিন্তাতেই যেন বাবা-মার ঘুম হারাম! হয়তোবা রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থার এই কারনটির জন্যেই নারীকে শিশুকাল থেকে বহুবার ‘না’ শব্দটার মুখোমুখি হতে হয়।

 

একটা সময় ছিল যখন নারীর স্কুল যাতায়াতে নিষেধাজ্ঞা ছিল, পরবতর্িতে এই বাধা অতিক্রম করে শুরু হলো নারীশিক্ষা ব্যবস্থা; শিক্ষা নারীকে অনেকটা এগিয়ে নিলেও এখনো সচরাচর অনেক ধারনাকেই পরিবর্তন সম্ভবপর হয়ে উঠেনি। নারী যত উচ্চশিক্ষিতাই হোক বা যত সামাজিক মযর্াদাসম্পন্নই হোক না কেন, অলিখিত একটা নিয়মই আছে যে নির্দিস্ট সময়ের ভেতরে বিয়ের পিঁড়িতে না বসলে তাঁর জন্মই হয়ে যাবে আজন্ম পাপ। প্রাপ্তবয়স্ক বিবাযোগ্যা কোন মেয়ে ঘরে থাকলে যত না চিন্তা থাকে বাবা-মার, তারচেয়ে ঢের বেশি ঘুম হারাম হয় প্রতিবেশী আর কথিত আত্নীয়-স্বজনের! এক্ষেত্রে মায়ের চেয়ে মাসীর দরদ একটু বেশীই লক্ষ্যনীয়; এর পরেও কথা থেকে যায়, উচ্চশিক্ষিতা সেই নারীটি যদি সৌভাগ্য অথবা দূর্ভাগ্যক্রমে স্বামীর চাইতে অধিক যোগ্যতাসম্পন্ন হয়, তবে বেচারা স্বামী সর্বক্ষণই থাকবে হীনমন্যতায়। সমাজে নিজের স্ত্রীর পরিচয় যতোটা সম্ভব সেন্সরে কাটছাঁট করে তবেই প্রকাশ করবে; পারতোপক্ষে স্বীকারই করবে না যে তাঁর স্ত্রী নিজের চাইতে অধিক যোগ্যতাসম্পন্ন একজন। এমন লোককেও আমি দেখেছি যে কিনা তাঁর স্ত্রীর উপার্জিত টাকায় ঘর চালিয়েও দিনের পর দিন ঐ স্ত্রীটির সাথেই খারাপ ব্যবহার করে চলেছে। এটা ছিল কতিপয় কথিত ভদ্র সমাজের গল্প, এবারে আসা যাক সমাজের একটু নীচু স্তরের মানুষের কথায়। আমাদের বাসায় একজন বুয়া কাজ করতেন, ইংরেজীতে আমরা যাকে বলি ‘মেইড’। বয়স খুব বেশী ছিল না, তবে কঠিন বাস্তবতা আর সংসারের ভারে জর্জরিত, জীবন সংগ্রামে পরাজয় না মানা এক নারীর মূর্ত প্রতিক ছিল সে; সকাল থেকে সন্ধ্যা পরিশ্রম করে উপার্জনের সমস্তটাই তুলে দিতো স্বামীর হাতে! তারপরেও স্বামী নামের এই অমানুষটার নির্যাতনের হাত থেকে রেহাই ছিল না তাঁর। বেচারী বুয়া আমাদের বাসায় এসে স্বামীর নামে হাজারো অভিযোগ করলেও কখনোই এই স্বামীটিকে ছেড়ে দিতে সাহস করেনি কথিত সমাজব্যবস্থার ভয়ে। আফটার অল পতি দেবতা বলে কথা, গায়ে হাত তুলতেই পারে। এই বুয়া সমাজের নিপীড়িত নারীর কেবল একটা উদাহরণ মাত্র; এরকম অনেক নারীই সমাজ বা লোকনিন্দার ভয়ে স্বীকার করে নিচ্ছে অমানবিক নির্যাতনকে। সেইদিন ফেসবুকে আমার এক পরিচিতার স্ট্যাটাস পড়লাম, স্ট্যাটাসে তিনি তাঁর প্রতি শ্বশুরবাড়ির লোকের দূর্ব্যবহার আর মানসিক নির্যাতনের কথা উল্লেখ করেছেন; তিনি যথেস্ট শিক্ষিত ভদ্র পরিবারেরই সদস্য, আধুনিকা, সুন্দরী, শিক্ষিতা আপাতদৃষ্টিতে কোন কমতি নেই ভদ্রমহিলার মাঝে। কিন্তু তারপরেও নির্যাতন বা প্রতিবন্ধকতার স্বীকার তিনি হচ্ছেন; তিনি হয়তো তাঁর স্যোশাল পজিশনের কারনে ফেসবুকে তাঁর কস্টের কথা অন্যদের সাথে শেয়ার করছেন, কিন্তু আমাদের বাসার সেই বুয়ার মতো অনেকেই আছে যারা নির্যাতিত হয়েও দিব্যি কাটিয়ে দিচ্ছে জীবন।

 

কোথায় যেন পড়েছিলাম ‘নারীর চরিত্র হবে জলের মতো, যে পাত্রে রাখা হবে, তারই আকার ধারন করবে নারী’! অর্থাৎ জলের মতোন হওয়াটা কেবল নারীর পক্ষেই আবশ্যক; যে নারীকে অতিপ্রাচীন ধর্মও স্বীকার করে নিয়েছে শক্তির আধার হিসেবে, সমাজ কিংবা সংসারের প্রয়োজনে সেই নারীকেও হতে হবে জলের মতো নিরাকার। খুব স্বভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন আসতে পারে, জলের মতো নিরাকার বলতে আদৌতে কি বোঝানো হয়েছে! জলের মতো বলতে স্বকীয়তা বর্জিত নারীকেই বোঝানো হয়েছে, যার নিজস্ব মতামত বলতে আদৌ কিছু থাকার নেই; বর্তমান যুগে নারীদের বেশ বড় একটা অংশ জুড়েই উপার্জক্ষম নারীর অস্তিত্ব দেখতে পাই। সংসারে এদের মতামতের গুরত্ব থাকলেও প্রাধান্য থাকার ব্যপারটা বিরল।

 

তবে সবকিছুর পরেও একটা কথা না বললেই নয়। অতি সম্প্রতি নারীশিক্ষা এবং নারীর অধিকার নিয়ে অনেকটাই সচেতনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে বর্তমান সময়ে। এই শিক্ষা ও অধিকার নারীকে নিজস্ব অবস্থানের পাশাপশি মানসিক দৃঢ়তা দিয়েছে, যার মাধ্যমে আজ হাজারো নির্যাতন, নিপীড়ন এবং প্রতিবন্ধকতার পরেও নারী বেঁচে আছে মাথা উঁচু করে। সেই সমাজব্যবস্থা সত্যিই এক বিরল দৃষ্টান্ত যার মাধ্যমে নারীর অবস্থান সুনিশ্চিত হয়েছে; আজকাল নারীদের পক্ষের আইনগুলো বেশ সক্রিয় ভাবে কাজ করে থাকে। মানুষের চিরাচরিত ধারনাকে পরিবর্তন করতে না পারলেও এই আইনগুলোই নারীর প্রকৃত অবস্থানকে শক্ত করেছে। একই সাথে নারীর নিরাপত্তাকে করেছে অনেকটাই সুনিশ্চিত; এই নিরাপত্তার মধ্যে দিয়ে অনেক নারীই নিজের জীবন গুছিয়ে নিয়েছে নিজের মতো করে। আঁধারে বন্দিনী সেই নারী আজ অনেকটাই দেখেছে আলোর মুখ। এই আশার আলো তাদের জীবনকে করেছে আগের তুলনায় সহজ ও গতিশীল;নারীর ক্ষমতায়ন নারীকে নিশ্চিতভাবে স্বাধীনতা দিলেও কিছু ক্ষেত্রে এই স্বাধীনতার অপব্যবহারও লক্ষ্য করা যায়। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে কিছু মানুষ এই ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে অন্যায়ভাবে সুবিধা অর্জনের প্রায়াশ করে থাকে; বর্তমানের প্রেক্ষিতে এই ধরনের নারীর সংখ্যাও দেখা যায় কমবেশি। নারী জলের মতো নিরাকার নয় যে তাকে যখনতখন আকার পরবর্তন করতে হবে। যে নারীত্বকে যুগে যুগে সন্মান ও শক্তির প্রতিকরূপে চিহ্নিত হয়েছে, সে নারীত্বের অবমাননা যেন না হয় কখনো। নারীর আজন্ম হেঁসেলের হাড়ি ঠেলে কাটাতে হবে, এমন কোন বাধ্যবাধকতা যেমন নেই, ঠিক তেমনি উচ্চশিক্ষিতা নারী হেঁসেলের দারগড়ায় পা রাখলেই তাঁর জাত যাবে, এমন কথাও কোন মহাকাব্যে উল্লেখ নেই; বরং পরিবারকে পরিজনকে নিজ হাতে সেবা করা একজন নারীর অধিকার; ভুল ধারনার মধ্যে থেকে নিজের অধিকার থেকে যেন কখনোই বন্চিত না হই। যে সমাজে নারীরা ছিল কোণঠাসা, আজ সেই সমাজ যদি নারী ক্ষমতায়নে পক্ষে কথা বলে, তবে সমাজের কাছে আমরা যেন কখনোই নিজেদের ক্ষুদ্র ও অযোগ্য হিসেবে তুলে না ধরি। বহুকালের ‘না’কে জয় করে আজকে যে নারী স্বয়ংসম্পূর্ণা, সেই নারী যেন নিজের গুনে তাঁর শক্তি, ক্ষমতা ও সন্মান ধরে রাখে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here