প্রচ্ছদ সাহিত্য নবাব ভাই ও তাঁর ‘দীপ্ত পথচলা’র আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ণ

নবাব ভাই ও তাঁর ‘দীপ্ত পথচলা’র আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ণ

157
0
কাইয়্যুম আব্দুল্লাহ: বিলেতের প্রাচীনতম সংবাদপত্র, সাপ্তাহিক জনমত সম্পাদক জনাব নবাব উদ্দিন, আমাদের প্রিয় নবাব ভাইকে কেন্দ্র করে ২ ফেব্রুয়ারী, রোববার মঞ্চস্থ হয়ে গেলো এক অনন্য অনুষ্ঠান। ওই সন্ধ্যায় উপস্থিত সুধীজন নানাভাবে নবাব ভাই ও তাঁর সাংস্কৃতিক-সাংবাদিক জীবনের “দীপ্ত পথচলা”র আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন করেন।
অনুষ্ঠানটিকে ভালোবাসা ও বিষাদের যুগলবন্দীই বলা যায়।কারণ হলো- নবাব ভাইর তিনটি বইয়ের প্রকাশনায় কমিউনিটির সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতি বিশেষ করে তাকে নিয়ে মূল্যায়ণধর্মী গ্রন্থ “দীপ্ত পথচলা”য় সবার অকুণ্ঠ, অফুরান ভালোবাসার স্বত:স্ফূর্ত প্রকাশ ছিলো প্রসংশনীয়। শেষ পর্যায়ে নবাব ভাইর বক্তব্যে জনমত থেকে তাঁর বিদায় নেওয়ার ঘোষণা সেখানে কিছুটা হলেও বিষাদের ছায়া ফেলে।তবে বাগাড়াম্বরহীন পুরো অনুষ্ঠানটি ছিলো প্রায় নিপুন ও ডিজিটাল টেকনোলজির ব্যবহারসহ নানা নান্দনিকতায় পূর্ণ। তাই শুরুতেই আয়োজনের সাথে জড়িত সবাইকে ধন্যবাদ
তিনটি বইয়ের মধ্যে “নবাব উদ্দিন: দীপ্ত পথচলা” বইটিই ছিলো প্রধান আকর্ষণ। ৭১ জন লেখকের সমৃদ্ধ লেখাগুলোর পুরোটাই ছিলো তাঁর প্রতি নিখাদ ভালোবাসা এবং তাঁর বহুমাত্রিক দক্ষতা ও সৃজন কর্মের স্বীকৃতি। বাকী দুটি বই যথাক্রমে বিভিন্ন সময়ে লেখা কলামের সন্নিবেশ “যেতে যেতে পথে” এবং সম্পাদিত গ্রন্থ “ইস্ট এন্ড 1978: রেসিস্ট মার্ডার অব আলতাব আলী”। তিনটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন বিলেতের সফল ২১ ব্যক্তিত্ব।
অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ “নবাব উদ্দিন: দীপ্ত পথচলা” গ্রন্থটির উপর সংক্ষিপ্ত অথচ চমৎকার আলোচনা উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট সাংবাদিক বুলবুল হাসান। তাঁর সারগর্ভ আলোচনার পর বলা যায় সেটি আর তেমন না পড়লেও চলে। তারপরও ঘরে ফিরেই (নিদ্রারাণীর তেমন তাড়া না থাকায়) গভীর রাত পর্যন্ত বেশ কিছু লেখা পড়ার চেষ্টা করলাম। পড়তে পড়তে আবাক হলাম যে, প্রায় সবগুলো লেখাই অভিন্ন! সবাই বলতে চেয়েছেন তাঁর বহুমাত্রিক যোগ্যতা ও দক্ষতার কথা। একই সাথে তাঁর সারল্যের কথাও। নবাব ভাইকে মাঝে মধ্যে কথাবার্তায় কঠিন মনে হলেও তাঁর ভেতরকার শিশুমনের সন্ধান প্রায় সবার লেখায় ফুটে ওঠেছে। সবার লেখার সাথে এই নগন্যের “বহুমাত্রিক ব্যক্তিপ্রতিভা” শীর্ষক লেখাটির সাযুজ্য খুঁজে পেয়েও আপ্লুত হয়েছি।
নবাব ভাইর মনটির রং সত্যি কচি পাতার মতোই সবুজ ও সতেজ। তবে সময়ের ব্যবধানে, কালের কষাঘাতে কিংবা প্রাকৃতিক নিয়মে সবুজ বৃক্ষ বা পত্রপল্লবে ধুসরতা নেমে আসতে বাধ্য। কিন্তু যে মানুষের মনের রঙ চিরসবুজ তাকে বয়সের ক্লান্তি, জরাব্যধি কোনকিছুই হার মানাতে পারে না। নবাব ভাই সেই বিরলপ্রজদের অন্যতম। সেটি তাকে নিয়ে লেখাগুলোর পরতে পরতে চমত্কারভাবে প্রতিভাসিত হয়েছে।
সত্যি বলতে কি জনমত থেকে নবাব ভাইর এই বিদায়কে আসলে বিদায় বলা যাবে না। এটা ঠিক যে তিনি জনমত নামক একটি প্রতিষ্ঠান থেকে বিদায় নিয়েছেন কিন্তু তাঁর যে মননশীল কর্মকান্ড তা থেকে চাইলেও তিনি নিজেকে মুক্ত করতে পারবেন না, সচরাচর মানুষ তা পারেও না। তাছাড়া নবাব ভাই জনমতের কঠিন সময়ে যে সাহসী নাবিকের ভূমিকা রেখেছেন অর্থাৎ ২২ বছরের সম্পদকের দায়িত্বসহ দীর্ঘ ৩০ বছরের সম্পৃক্ততা, সেটি তাকে বহুদিন স্মরণীয় ও বরণীয় করে রাখবে বলে আমার বিশ্বাস। এছাড়া মানুষের নিজের আত্মতৃপ্তির একটি বিষয় থাকে। বিলেতের বাংলা মিডিয়ায় নবাব ভাইর দীর্ঘ পথচলা ও বিভিন্নভাবে নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়টি তাকে সেই তৃপ্তি দানে যথেষ্ট।

নবাব ভাইর নাম নিয়ে আমরা অনেক সময় ঠাট্টা করি, টিফফনি কাটি। তবে কোনকিছু নবাবীভাবে অর্থাৎ গর্জিয়াসলি করার প্রবণতা নবাব ভাইর মধ্যে আমরা দেখতে পাই। সেই অর্থে বর্ষীয়ান ও বিশিষ্ট সাংবাদিক-কলামিস্ট আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী নবাব ভাই সম্পর্কে সত্যি বলেছেন, তিনি জনগণের নবাব। এছাড়া বাংলা মিডিয়ার প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের প্রেসিডেন্ট এমদাদুল হক চৌধুরী, কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব মাহমুদ হাসান এমবিই, ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্ব ইকবাল আহমদ ওবিই ও চ্যানেল এস’র ফাউন্ডার মাহী ফেরদৌস জলিল তাদের বক্তব্যে যা যা বলেছেন তাতেও ছিলো অকৃত্রিম প্রশংসার হার্দিক প্রকাশ।
অনুষ্ঠানে বাড়তি পাওনা হিসেবে ব্যতিক্রমী আমেজ দিয়েছে সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশেষ করে টিভি মিডিয়ার সুপরিচিতসবমুখ, আমাদের বাকশিল্পীবৃন্দ যথাক্রমে উর্মি মাজহার, তৌহিদ শাকীল, শহীদুল ইসলাম সাগর, মুনিরা পারভীন ও সালাউদ্দিন শাহীনের মনোজ্ঞ পরিবেশনায় নবাব ভাইর সৃজনকর্মের প্রকাশ।
বিলেত ও বাংলাদেশের স্থানীয় থেকে জাতীয় পর্যায়ের সাংবাদিক, সম্পাদক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বসহ কমিউনিটির বিশিষ্টজনদের মূল্যায়নভিত্তিক ডকুমেন্টারিটিতেও ছিলো নবাব ভাই সম্পর্কে নতুন অনেককিছু জানার ও দেখার মতো। অনুষ্ঠান উপস্থাপনা ও “দীপ্ত পথচলা”র সম্পাদনায় মুনশিয়ানার জন্য জনমতের নির্বাহী সম্পাদক, গল্পকার সাঈম চৌধুরীও ধন্যবাদ পাওয়ার দাবী রাখেন।
পরিশেষে বলতে চাই — কিছু কিছু মানুষ আছেন যারা প্রাতিষ্ঠানিক অব্যহতি নিলেও তাদের জীবনডিকশনারিতে অবসর বলতে কিছু নেই। তাছাড়া নবাব ভাই একটি প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব থেকে অব্যহতি নিয়ে মানবসেবার মতো দাতব্য কাজে নিয়োজিত হওয়ার ঘোষণা ও সূচনা দিয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। সে হিসেবে তাঁর আর অবসর কোথায়? এসব কিছুর পরও নবাব ভাই তাঁর সৃজনশীলতা ও স্বভাবসুলভ প্রাণচাঞ্চল্য নিয়ে বরাবরের মতো আমাদের বাংলা মিডিয়ায় সক্রিয় এবং অব্যাহত থাকুক তাঁর দীপ্ত পথচলা — এটাই সবার মতো আমারও প্রত্যাশা।