প্রচ্ছদ নজরুল ইসলাম বাসনের কলাম ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে গোয়াইনঘাটে জাস্ট হেল্প আই হসপিটাল

ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে গোয়াইনঘাটে জাস্ট হেল্প আই হসপিটাল

547
0
 নজরুল ইসলাম বাসন  :  ১৯৬৬/৬৭ সালের কথা, আমরা আম্বরখানা কলোনীর সরকারি কোয়ার্টার ছেড়ে শেখঘাট এলাকায় আমাদের নতুন বাসায় গেছি , পুরো শেখঘাট এলাকা তখন ছবির মত । একটি সুন্দর পাড়া ছিল শেখঘাট। কাজির বাজার ছিল পাশেই,তার পাশে সুরমা নদী। এখনকার মত ইট সিমেন্টের বস্তি তখনও গড়ে উঠেনি, অপরিকল্পিত বিল্ডিং -দোকান পাট শেখঘাটের আকাশ সীমাকে নস্ট করে দেয়নি। নব-নির্মিত কাজিরবাজার ব্রীজের দ্বারা এলাকার প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ও নস্ট হয়নি। এমন একটি পরিবেশে আমরা বড় হয়েছি। তখন খুব সুন্দর ছিল পরিবেশ, প্রাকৃতিক পরিবেশও ছিল আরো সুন্দর। সেই সাথে ছিল সুন্দর ছিল পারিপার্শ্বিক মানুষ,তাদের মাঝে ছিল মায়া-মমতা আদর ও স্নেহ।
আমি আজ যে মানুষটার কথা বলছি, তিনি কোন নেতা ছিলেন না, কোন বিখ্যাত মানুষ ও ছিলেন না, তিনি ছিলেন নিতান্ত একজন সাধারন অন্ধ ভিক্ষুক, তার চুল দাড়ি ছিল পাটের মত সাদা, দীন হীন দরবেশের মত চেহারা। আমাদের পাড়ার ভেতর থেকে তিনি আসতেন তার বাড়ি কোথায় ছিল জানতাম না,তিনি সুর করে তিনি আল্লাহর নাম নিতেন আর হেটে হেটে আসতেন। তার হাতে থাকতো একটি থালা আর একটি লাঠি, লাঠি দিয়ে ঠুকে ঠুকে ফুটপাথ দিয়ে হাটতেন। মাঝে মাঝে আমরা ছোটরা তার হাতের লাঠি নিয়ে ঐ অন্ধ ভিক্ষুক মানুষটাকে তার জায়গায় বসিয়ে দিতাম, তিনি বসতেন করুনা হোমিও ফার্মেসীর বারান্দায়। আজ করুনা হোমিও ফার্মেসীও নেই, সেই অন্ধ ভিক্ষুক ও নেই। বদলে গেছে আমার শৈশবের এলাকা, নদীর বুক চিরে উঠেছে কাজির বাজার সেতু, জানিনা এই সেতুর কি প্রয়োজনীয়তা ছিল? এর চাইতে বেশি প্রয়োজন শিশুদের জন্যে স্কুল, হাসপাতাল। মানুষের ঘর-বাড়ি দোকান-পাট ভেঙ্গে এই কাজির বাজার ব্রীজ নির্মান করে কার লাভ হয়েছে? নীতি-নির্ধারক আর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পকেটে গেছে কোটি কোটি টাকা। অথচ এই টাকায় এই এলাকায় স্কুল-কলেজ-হাসপাতাল নির্মান করা যেতো অনায়াসে। জনগনের কথা ভাবার সময় আছে কার ? এর উত্তরে বলা যায় সুদুর প্রবাস থেকে কিছু কিছু মানুষ আছে যারা শুধু স্বপ্ন দেখেনা,স্বপ্নের বাস্তবায়নও করে। এই রকম একটা অবস্থায় ম্যাঞ্চেস্টারের বাসিন্দা মিজানুর রহমান চৌধুরি এক সময়ে জাতীয় হকি টিমে খেলতেন, তিনি মিরা বাজারের মৌসুমি হকি টিমের ছিলেন একজন সংগঠক। বছর তিনেক আগে অনুজ প্রতীম মিজান ফোন করে বল্লেন গোয়াইনঘাট এলাকার সীমার বাজারে জমি কিনেছেন সেখানে চক্ষু হাসপাতাল নির্মান করতে চান। নির্ধারিত সময়ের আগেই জাস্ট হেল্প আই হাসপাতালের ভবন নির্মিত হয়ে গেল। অনুজপ্রতীম মিজান নিরলস শ্রম দিয়ে দেশে-বিদেশে একটি শুভাকাঙ্খী গ্রুপ গড়ে তুলেছেন। এরা থাকে আর্থিক ও মানসিক সহযোগিতা প্রদান করে চলেছেন। বর্তমানে প্রতি মাসে ৪/৫ শত মানুষ জাস্ট হেল্প আই হাসপাতালে চক্ষু চিকিৎসার সেবা গ্রহন করে চলেছেন।

জাস্ট হেল্প আই হাসপাতালের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান চৌধুরি বর্তমানে আরো উ”চাকাঙ্খী প্রকল্প হাতে নিয়েছেন বিখ্যাত এনজিও ভার্ডের সহযোগিতায় তিনি জাস্ট হেল্প আই হসপিটালকে একটি পুর্নাঙ্গ হাসপাতাল হিসাবে গড়ে তুলার জন্যে দোতালার কাজ শুরু করতে যাচ্ছেন অচিরেই। সম্প্রতি চ্যানেল এস- এ একটি ফান্ড রেইজিং অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় এতে বেশ কিছু সহৃদয় ব্যাক্তি ট্রাস্টি হবার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। একজন সহৃদয় মাতা এগিয়ে এসেছেন ১০ লক্ষ টাকা দেয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে, আরেকজন সহৃদয় ব্যাক্তি বলেছেন তিনি একলক্ষ টাকার সিমেন্ট প্রদান করবেন। এভাবে যদি কেউ ইট, বালি এবং রড দেয়ার আশ্বাস দেন আর কেউ যদি মিস্ত্রির খরচ দিয়ে দেন তাহলে দোতালার কাজ শেষ হয়ে যাবে অচিরেই। দোতালার কাজ কম্পিলিট হয়ে গেলে জাস্ট হেল্প আই হসপিটাল- একটি পুর্নাঙ্গ চক্ষু হাসপাতাল হিসাবে গড়ে উঠবে এতে কোন সন্দেহ নেই। বর্তমানে ইউরোপ-আমেরিকার বহু ধনাঢ্য প্রবাসি আছেন যারা চাইলে এ ধরনের একটি চ্যারিটিকে মসৃন ভাবে চলার জন্যে সহযোগিতা করতে পারেন। শুধু আর্থিক সহযোগিতা নয়, ইক্যুপমেন্ট, মেডিসিন, দিয়েও অনেকে সহযোগিতা করতে পারেন, এরকম অনেক ব্যাক্তি আমাদের সমাজে আছেন।,আমাদের অনেক বাঙালিরা এখন বুটস বা অন্যান্য বৃটিশ ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন তারা চাইলে অনেক ভাবে সহযোগিতা করতে পারবেন জাস্ট হেল্প আই হসপিটালকে । আমরা সকলেই জানি আমাদের এলাকার কত মানুষ পয়সার অভাবে চোখের ডাক্তার দেখাতে পারে না, সামান্য চোখের রোগে অনেকে অন্ধ হয়ে যায়, শিশু, বৃদ্ধ কেউ এর হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন। বয়স্ক লোকদের চোখে ছানি পড়ে ,চোখের ছানি কাটাতে পারলে মানুষটি অন্ধত্ব কাটাতে পারতো। অন্ধ যেন দেহ আলো বলে একটা প্রবাদ আছে বই – পত্রে , বাংলাদেশে এখনও বহু শহর আছে যেখানে আলাদা চক্ষু হাসপাতাল নেই, বাংলাদেশে অনেক থানা বা ইউনিয়ন আছে যেখানে আলাদা চক্ষু হাসপাতাল নেই, গ্রামেতো নেই-ই। পরিশেষে বলতে চাই একজন মিজান যদি তার সহযোগিদের নিয়ে ম্যাঞ্চেস্টারে বসে জাস্ট হেল্প আই হসপিটালের মত এতবড় একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারেন তাহলে তাকে যদি সহযোগিতা করা হয় তাহলে এই প্রতিষ্ঠানটি একদিন শুধু সিলেটে নয় সারা বাংলাদেশের একটি স্বনামধন্য দাতব্য প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে উঠতে পারে। সেই আশায় আমরা কাজ করে চলেছি।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও গবেষক

০৩/১২/১৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here