প্রচ্ছদ সফল নারী জ্যামাইকার স্প্রিন্ট কুইন এলিন টম্পসন

জ্যামাইকার স্প্রিন্ট কুইন এলিন টম্পসন

793
0
মো: আবদুস সালিম: বিশ্বমঞ্চে পতাকা ওড়াচ্ছেন জ্যামাইকার নারী দৌড়বিদ এলিন টম্পসন। তিনিই এখন বিশ্বের দ্রুততম মানবী। এই পরীক্ষা তাকে দিতে হয়েছে রিও ডি জেনেইরোতে অলিম্পিক প্রতিযোগিতায়। তাকে এখন বলা হচ্ছে জ্যামাইকার স্প্রিন্ট সাম্রাজ্যের সম্রাজ্ঞীও। জ্যামাইকান আরেক নারী স্প্রিন্টার শেলি অ্যান ফ্রেজার প্রাইসের স্বপ্ন ছিল মেয়েদের ১০০ মিটারে অলিম্পিকে স্বর্ণ জয়ের হ্যাটট্রিক করার। কিন্তু ফ্রেজার প্রাইসের সেই স্বপ্ন ভেঙে গেল। স্বর্ণ তো দূরে থাক, হলেন তৃতীয়। অর্থাৎ প্রাইসকে হটিয়ে তার সিংহাসন দখলে নেন এলিন টম্পসন।
স্প্রিন্টার শুরু করেছিলেন ভালো, প্রাইসের সাথে সমানে সমান বা সমান তালেই ছিলেন (৫০ মিটার পর্যন্ত)। এরপরই টম্পসন সৃষ্টি করলেন চমক। দৌড়েছেন বড় বড় পায়ে। পেছনে পড়ে যান অন্য দৌড়বিদরা। এতে টম্পসন সময় নিয়েছেন ১০.৭১ সেকেন্ড। যুক্তরাষ্ট্রের টোরি বাউয়ির সময় লাগে ১০.৮৩ সেকেন্ড। আর প্রাইস নেন ১০.৮৬ সেকেন্ড। যথেষ্ট লম্বা। উসাইন বোল্টের ন্যায় হেলেদুলে দৌড়াননি টম্পসন । মাত্র দু’পা এগিয়ে থেকেই টম্পসন শেষ করলেন দৌড়। বলা যেতে পারে এটাই টম্পসনের সেরা অর্জন। এর আগে ২০০ মিটার স্প্রিন্ট জিতে নেন বেইজিংয়ে ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে ২০১৫ সালে। এটাও ছিল তার বড় সফলতা। তাতেও কেঁপেছিল বিশ্ব। চলমান অলিম্পিকেও যে, তিনি সেরা হবেন তা সংশ্লিষ্টরা বুঝতে পেরেছিলেন খেলার শুরুতেই। টম্পসন জিতলেন অলিম্পিকের নারীদের সবচেয়ে দামি মেডেল। টম্পসন বিশাল পর্দায় দেখেন তার সফলতার (দৌড়ের) ছবি। তখন তিনি মনে করেন, টিভির পর্দায় খেলা দেখছে আমাদের গ্রামের সবাই। তাতে তার আরো ভালো লাগছিল। অথচ তার পরিচিতরা কোনদিন ধারণাও করেনি, টম্পসন সত্যি সত্যিই অলিম্পিকে দামি মেডেল পাবেন। আর এটাই সবার জন্য যেন একটা চমক। তা তাদের গর্বও।
এদিকে আরেক ল্যান্ডস্লাইড ভিক্টরি বা ভূমি কাঁপানো বিজয় আসে টম্পসনের জীবনে। ১০০ মিটারের সাথে টম্পসন জিতলেন ২০০ মিটারটাও। আর তাকে নিয়ে হটলাইন হলো এলিন টম্পসনের ‘ডাবল’ জয়। এটাই প্রথম অলিম্পিক টম্পসনের । তিনি ভাগও বসিয়েছেন উসাইন বোল্টের জনপ্রিয়তায়। টম্পসন এখন খেলাপ্রেমী তথা জনতার নায়িকা। আবার নতুন স্প্রিন্ট কুইনও। ক্রাউড পুলারও। কেননা তার চাহনিতেও যেন আনন্দের ঝলকানি। দৌড়ে ইনজুরি কিছুটা হয়েছিল। তা তোয়াক্কা করেননি টম্পসন। তাই আবারো স্বর্ণ জেতা। তবে তা পেতে নিজের সবটুকু কাজে লাগাতে হয়েছে বললেন, এলিন টম্পসন। খেলায় যে কৃতিত্ব তিনি দেখিয়েছেন তাতে বলা যেতে পারে, তিনি নাম লিখিয়েছেন ক্রীড়া জগতের মহাতারকাদের ভুবনে। আরো স্বর্ণ জয়ের সম্ভাবনা বা হাতছানি আছে বলেও মনে করেন অনেকে। ২০০ মিটার জিততে তার সময় লেগেছে ২১.৭৮ সেকেন্ড। নেদারল্যান্ডসের দানে শিপারসের (বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে) বিপক্ষে হারের প্রতিশোধও নেয়া হলো এ নতুন রানির।
ক্রমেই এসে যায় তার ভবিষ্যতের প্রসঙ্গটা। টম্পসন বলেন, ‘আমি সিরিয়াস। চেষ্টা চালিয়ে যাবো যেন দীর্ঘদিন ধরে রাখতে পারি নিজ জন্মভূমি বা জ্যামাইকার এ আধিপত্য। বয়স সবেমাত্র ২৩ বছর। তাই আরেকটা অলিম্পিক হয়তো আমার সামনে আসবে। একের পর এক স্বর্ণ জেতা মানে বঞ্চিত নারীর সাফল্যের গল্প রচনা করা। অথচ তার জীবনের প্রথম প্রহরে এ ধরনের কোনো ইঙ্গিতই ছিল না। কারণ টম্পসন ছিলেন খুবই সাদামাটা বা সাধারণ মানের মেয়ে। টম্পসনকে বাদ দেয়া হয়েছিল ১০০ মিটার রিলে (৪ গুণিতক) টিম থেকেও। তবে কোনো না কোনো সময়ে কোনো কারণে বদলে যায় অনেকের জীবন। এমনটি হয়েছে টম্পসনের জীবনেও। খেলায় তার উত্থানের পেছনে রয়েছেন দুইজন ফ্রান্সিস। তারা হলেন- পল ফ্রান্সিস এবং স্টেফান ফ্রান্সিস। টম্পসন যাচ্ছেতাই খেলেছিলেন আঞ্চলিক একটি মিটে। এমন বাজে পারফরম্যান্স দেখে কোচ পল খুবই দুঃখ পেয়েছিলেন। নয়া স্প্রিন্ট কুইন টম্পসন মনে করেন, তার শাসন আমাকে অনেক এগিয়ে নিয়ে গেছে ক্রীড়া জগতে। কোচ তাকে বুঝাতে চেয়েছেন, তুমি এখন স্কুলপড়ুয়া নও। লড়তে হচ্ছে ঝানু পেশাদারদের সাথে। তাই বাজে সব বাদ দিয়ে সিরিয়াস হওয়ার বিকল্প নেই, যদি ভালো করতে চাও।
শেলি অ্যান ফ্রেজার। জ্যামাইকার নারী অ্যাথলেটদের একজন অনুপ্রেরণাকারী বা শুভাকাক্সিও। তিনি বলেন, টম্পসনের সাথে দৌড়ে আমি পেছনে থাকলেও তবু আমি খুশি। খুশির কারণ হলো, মুকুটটাতো থাকল জ্যামাইকারই। শেলি আরো বলেন, আমার অনেক আনন্দ হচ্ছে, টম্পসনের জন্য। ২০০৮ ও ২০১২ অলিম্পিক আমার হলেও ২০১৬ টম্পসনের। সে যেন একজন রোল মডেল। তার খেলা দেখে মেয়েরা শিখবে কি করে ভালো খেলোয়াড় হওয়া যায়। এসব মন্তব্য টম্পসনকে আরো অনুপ্রেরণা দিয়েছে। যে কারণে সামনের খেলাগুলোতে টম্পসন আরো ভালো করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
এলিন টম্পসনের জন্ম ২৮ জুন ১৯৯২ সালে জ্যামাইকার ম্যানচেস্টারে। দেশটির উত্তরাঞ্চলের বানানা ভিলেজের সাহসী মেয়ে। তবে তার জন্ম অতিদরিদ্র পরিবারে। বিশেষ করে শৈশবের দারিদ্র্য বারবার মনে করিয়ে দেয় এলিন টম্পসনকে। মাঝে মধ্যেই তাদের সংসার চালাতে ধার-কর্য করতে হতো পাড়া-পড়শির কাছ থেকে। খেলায় ভালো করার সাথে সাথে কমতে থাকে দারিদ্র্য। টম্পসন বলেন, আমি ভাবতেও পারিনি সারা বিশ্ব একদিন আমাকে এভাবে চিনবে ও জানবে। যা আমার শৈশব বিচার করলেই সহজে বুঝা যায়। এখন তার নামের বিশেষণের যেন শেষ নেই। এমনকি অনেকে তাকে ‘লৌহমানবীও’ বলছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here