প্রচ্ছদ ফিচার চৈত্র সংক্রান্তি আর পয়লা বৈশাখের দিনগুলি

চৈত্র সংক্রান্তি আর পয়লা বৈশাখের দিনগুলি

278
0
ছবি: সংগ্রহ।
রোকশানা আক্তার: সেই সময়ও আমার শহরে বৈশাখ আসতো। পয়লা বৈশাখের আগের দিনে আমি ,শান্ত মোদক আর বিথিক রায় সকালে শহরের পি টি আই ইনিস্টিটিউট এর কাছে প্রাইভেট পড়ে আসার সময়, প্রথমে চৈত্র সংক্রান্তিতে বন্ধু শান্তার বাড়ীতে মাসিমার হাতের বানানো হরেকরকম পিঠার সাথে পাটালি গুড়ে খিরের পুর দেয়া পাটি সাপ্টা সাথে বড় বড় রোসগুল্লা এবং ছিল বন্ধু বিথিক রায়ের বাড়িতে মাসিমার হাতের ফুলের ছাঁচে গড়া সাদা সাদা ফুঁটে থাকা নারিকেলের সন্দেশ খাওয়া , উম! বড় বেশী প্রিয় ছিল আমার।
খন এত ঘটা করে আমার ছোট শহরে পয়লা বৈশাখ উদযাপিত হতো না, শুধু সুলতানিয়া লাইব্রেরির কাছে শহরের একমাত্র টাউন হলে অথবা শহরের একমাত্র সঙ্গীত বিদ্যালয় সুরবিতানে সন্ধ্যায় গানে গানে পয়লা বৈশাখ বরণ করা হত। তখন এত ইলিশপান্তা খাওয়ারও বাড়াবাড়ি ছিল না ।
আমাদের বাড়িতে বাগান থেকে কয়েক ধরনের শাক আর বাজার থেকে আনা বিরাট দেশী রাতা মোরগ সাথে নতুন আলু দিয়ে ঝাল ঝাল ঝোলের তরকারি রান্না হত। সারা বাড়িতে শীলপাটায় গুঁড়া করা ভাজা জিরা সমেত মোরগের সালুন আর কাটা বাতাবি লেবুর ঘ্রাণে মৌ মৌ করত । খাওয়া পাতে সাথে থাকতো গরুর দুধে রান্না করা নারিকেলের পায়েস। বছরের পয়লা দিনে ভাল মন্দ খেলে নাকি সারা বছর যাবে ভাল খেয়ে তাই ছিল এই আয়োজন।

কোন কোন পয়লা বৈশাখের বিকেলে বাড়ির পূর্ব দিকে বিছিয়ে থাকা হলুদ সরিষা, পাকা ধানের ক্ষেত্ আর বিল ছাড়িয়ে ইনাথবাজ গ্রামের শেষ মাথায় আঠারমুড়া পাহাড় থেকে নেমে আসা খোয়াই গাঙের উপর জমে থাকা আকাশ কালো করা মেঘের কুন্ডলী হটাৎ রেগে জড়ো হওয়া সাথে নিয়ে পুরো  শহরের দিকে ধেয়ে আসতো। পিছনের উঠানে তারে মেলে দেয়া শুকনো কাপড় তুলতে আম্মার ক্রমাগত তাগদায় ছুটে গিয়ে,কাপড় তুলতে তুলতে কানে আসতো মাঠে চড়ানো গরু ছাগলের হাম্বা হাম্বা আর ম্যায় ম্যায় ডাক । তারপর বাড়ির কামরাঙ্গা ,নারিকেল ,পেয়ারা ,কাঁঠাল আর লেবু গাছে কালবৈশাখী আছড়ে পড়তো, এরপর আমাদের টিনের চাল ছাড়িয়ে একসময় পুরো শহরকে কালবৈশাখী তার হুংকার, মাতম আর বৃষ্টিতে নাকানি চুবানি খাইয়ে গাছ পালা ভেঙে গরমের তেজ কমিয়ে ফিরে যেত।
এখন প্রবাসে বয়সের এই তিপন্নতে দিনগুলো অতীত হয়ে মনে বড্ড বেদনা দেয়। প্রশমনের চেষ্টায় শুধু চোখ বন্ধ করে ফিরে ফিরে বার বার চলে যাই আমার ফেলে আসা শহর , মানুষ আর সেই সোনালী রুপালি দিনগুলোতে।

শুভ নববর্ষ। সাম্প্রদায়িকতা ,ধর্মীয় উন্মাদনা আর সকল অসততা অস্তাচলে ডুবে যাক ,নিপাত যাক। সম্প্রীতি ,ভালবাসা , মানবিকতার আর সততার মিলন বিভার ছটা ছড়িয়ে পড়ুক সবখানে। শুভ কামনা।