প্রচ্ছদ মতামত এ সমাজ নুশরাতদের জন্য নিরাপদ নয় ।

এ সমাজ নুশরাতদের জন্য নিরাপদ নয় ।

345
0
সারওয়ার-ই আলম: আত্মরক্ষার যে কৌশলটি নুশরাতের জানা ছিল তাহলো অধ্যক্ষের আপত্তিকর প্রস্তাবে ‘না’ বলা। একজন সাধারণ শিক্ষকতো নয়, সাক্ষাৎ অধ্যক্ষ। এরকম অধ্যক্ষদের কাছে নুশরাতের মতো সাধারণ ছাত্রীরা কতোটা অসহায় তা আমরা দেখেছি ভিকারুন্নেসার এক ছাত্রীর পিতামতার প্রতি সে প্রতিষ্ঠান প্রধানের আচরণ দেখে। যেখানে পিতামাতাকেই পাত্তা দেয়া দরকার মনে করেনা সেখানে চরিত্রহীন শিক্ষকেরা নুসরাতদের মতো অসহায় ছাত্রীদের যখন তখন নিজের কক্ষে ডেকে পাঠাবেন, কুপ্রস্তাব দেবেন- এতে অবাক হওয়ার কী আছে! বিশ্বাস করতে মোটেই কষ্ট হয় না যে ঐ লম্পট অধ্যক্ষের লালসার শিকার শুধুমাত্র নুসরাতই নয়, নিরপেক্ষ তদন্ত করলে এবং গোপনীয়তার নিশ্চয়তা দেয়া হলে এ একই অধ্যক্ষের আরো অপকীর্তির ফিরিস্তি হয়তো বেরিয়ে আসবে। এমনও হতে পারে পারিবারিক ও সামাজিক কারণে ভুক্তভোগীরা এতোদিন প্রকাশ্যে আসার সাহসই পায়নি।অধ্যক্ষের এই অনৈতিক আচরণের কথা কেউই জানতেন না- এটা বিশ্বাস করা মুশকিল। তার পিয়ন দারোয়ানতো কিছুটা হলেও জানার কথা।
আমাদের এ তথাকথিত সভ্য সমাজের প্রতি ধিক্কার জানিয়ে চলে গেলেন নুশরাত।এ সমাজ নুশরাতদের জন্য নিরাপদ নয়, নিরাপদ মানুষরুপী হিংস্র জানোয়ারগুলের জন্য, যারা ওঁত পেতে বসে থাকে সমাজের বিভিন্ন জায়গায় নুশরাতদের ঘায়েল করতে।প্রশ্ন হলো- আমরা কিভাবে নুশরাতদের নিরাপত্তা দিতে পারি? উন্নত দেশগুলো কী করে?
ব্রিটেনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ অন্য অনেক প্রতিষ্ঠানে যে কোন পদে নিয়োগের আগে ব্যক্তির কোনরুপ গুরুতর অপরাধের নজির আছে কিনা তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের মাধ্যমে যাচাই করা হয় যার নাম Disclosure and Barring Service বা DBS Check।বাংলাদেশে এ কাজটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের মাধ্যমে শিক্ষা মন্ত্রনালয় করতে পারে। প্রত্যেক নাগরিকের বিরুদ্ধে থানায় দায়ের করা অভিযোগ, সে বিষয়ে আদালতের রায় থাকলে রায়ের তথ্য, চারিত্রিক স্খলন প্রমাণিত হয় এমন অভিযোগের তথ্য সংরক্ষণ করা হলে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকুরীর শর্ত হিসেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় থেকে ‘সুনাগরিক’ বা ‘গুরুতর অভিযোগ নেই’ এরকম কোন সনদ জমা দেয়ার বিধান থাকলে আমরা হয়তো কিছুটা হলেও ছাত্র-ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবো। যদিও ব্যক্তির নৈতিক স্খলন কোন পর্যায়ে ঘটবে তা আগে থেকে জানার কোন সুযোগ নেই। তারপরও নিরাপত্তামূলক কিছু ব্যবস্থা থাকাটা জরুরী।
একইসাথে প্রত্যেকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা’ লাগানো এবং কেন্দ্রীয়ভাবে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার দপ্তরের মাধ্যমে তার নিয়ন্ত্রন করা হলে আশা করা যায় অপরাধপ্রবণ শিক্ষকেরা ক্যামেরার ডর ভয়ে কিছুটা হলেও নিজেদেরকে সংযত করবেন।
শোনা যাচ্ছে দেশের প্রত্যেকেটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘কম্পিউটার ল্যাব’ তৈরি করবে সরকার। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাই যদি না দিতে পারি, ল্যাব করে কী লাভ! কোটি কোটি টাকা খরচ করে তৈরী করা ল্যাবের কম্পিউটারে হয়তো জং পড়ে থাকবে।ডিজিটাল বাংলাদেশের পাশাপাশি নিরাপদ বাংলাদেশ তৈরী করাটাও যে আজ সময়ের একটি বড় দাবী, নুশরাতের মৃত্যু তাই প্রমাণ করে। কিন্তু ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনায়’ একটি জেলা শহরের সাধারণ পরিবারের একটি তরুণীর মৃত্যু সে দাবী প্রতিষ্ঠা করতে কতটা সক্ষম?
কোটি কোটি মানুষের ভালবাসায় সিক্ত নুশরাত। তারপরও এ লাশ, এ মৃত্যুর ভার বহন করতে অক্ষম বাংলাদেশ। নুশরাত হোক ধর্ষণ কিংবা শ্লিলতাহানীর সর্বশেষ নাম।আমরা আর একটিও অগ্নিদগ্ধ নুশরাত চাই না। আমরা চাই ওদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ।