প্রচ্ছদ নজরুল ইসলাম বাসনের কলাম আমার স্কুল ১৭৭ বছর যার বয়স

আমার স্কুল ১৭৭ বছর যার বয়স

833
0
নজরুল ইসলাম বাসন: ষাটের দশকের শেষের দিকে আমি যখন সিলেট সরকারি স্কুলের ষষ্ট শ্রেণীর ছাত্র তখন আমাদের স্কুলের ম্যাটিকে জয় জয়কার রেজাল্ট হত। পুরো ইষ্ট পাকিস্তানের মধ্যে রকিব ভাই ফাস্ট হয়ে তাক লাগিয়ে দিলেন সবাইকে। গভর্নমেন্ট স্কুলের আব্দুর রকিব তখন ঘরে ঘরে এক বিজয়ী বীরের নাম।
বাবা-মা আর অভিবাবকরা চাইতেন তাদের ছেলে রকিব ভাইয়ের মত হোক। রকিব ভাই এখন লন্ডনে বসবাস করেন। তিনি এক নিভূতচারি মানুষ। দেশের ক্রান্তি লগ্নে রকিব ভাইদের মত মানুষের প্রয়োজন রয়েছে।
রকিব ভাই ভাল রেজাল্ট করার পরের বছরগুলোতেও আমাদের স্কুলের রেজাল্ট ভাল হতো এবং যতদূর মনে পড়ে বর্তমানে ডাঃ মারুফ আলি ভাইও স্ট্যান্ড করেছিলেন ম্যাট্রিকে সত্ত্বুর দশকের প্রথম দিকে। উনার বড় ভাই মুন্সেফ আলীও ভাল রেজাল্ট করেছিলেন। অনেকে দেশ ছেড়ে চলে আসলেও দেশে অনেকে আছেন যারা আজ সুপ্রতিষ্ঠিত।
সিলেট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করে গেছেন এমন কৃতি ছাত্রদের অনেক নাম আছে তালিকায় যারা দেশ-বিদেশে যশ প্রতিপত্তির সাথে বিশেষ পেশায় নিয়োজিত ছিলেন এবং আছেনও। এই ধারায় আছেন মাননীয় মন্ত্রী আব্দুল আল মুহিত এখন বাংলাদেশের ফাইন্যান্স মিনিস্টার। বাংলাদেশ সচিবালয়ে, সেনাবাহিনীতে, আইন ব্যবসায়, চিকিৎসা অঙ্গনে এমন কি মিডিয়া অঙ্গনে আমাদের বড় ভাইয়েরা সগৌরবে আছেন। শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, ডাঃ অরুপ রতন চৌধুরী ছাড়াও লেখক সাহিত্যিকদের মধ্যে অনেকেই রয়েছেন যাদের কথা আমাদের অজানা। আমরা যদি প্রতি বছর পুর্ণমিলনী করতে পারি তাহলে আমাদের মধ্যে আরো যোগাযোগ বাড়বে বলে আমি বিশ্বাস রাখি।

আমাদের স্কুলে অনেকে লেখাপড়া করেছেন যাদের অভিভাবককে চাকুরীসূত্রে সিলেট আসতে হত, তাই অনেকে আছেন যারা বছর কয়েকদিনের জন্য সিলেট একটি সুন্দর সময় কাটিয়ে গেছেন। অনেকে অনেকে স্মৃতি বিজরিত স্কুল। যাদের অনেকের সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শৈশবের স্মৃতি বোধ হয় বার্ধক্যে এসে বেশি ভর করে তাই একটু বয়স হবার সাথে সাথে সবাইকে যেন মাটির দিকে টানে, টানে শেকড়ের দিকে তাই সবাই পুরোনো বন্ধুর খোঁজে হাত বাড়ায়। বার্ধক্যে এসে সবাই যেন ঠিকানা খোঁজে একে অপরের, স্কুল কলেজ আর ভার্সিটির বন্ধুদের নিয়ে পুনমিলনীর আয়োজন করে।
আমাদের স্কুল ১৭৭ পার করে এসেছে। আমাদের স্কুল গৌরবের সাথে পালন করেছে ১ শত ৭৫ বছর পুর্তির অনুষ্টানমালা। পুনমিলনী মানেই নবীন আর প্রবীনের মেলা। পুর্নমিলনী অনুষ্ঠানে যারা যোগ দেন তারা যেন সমুদ্র সেঁচে মুক্তা কুড়িয়ে আসেন। সেই দিকে লক্ষ্য রেখে অনুজ প্রতীম মিজান আমাদের স্কুলের পুনমিলর্নি করার উদ্যেগ নিয়েছেন লন্ডনে। আরো ২/১ বার উদ্যেগ নেয়া হয়েছিল কিন্তু বেড়ালের গলায় আর ঘন্টা বাধা হয়নি। তবে বেড়ালের গলায় ঘন্টা বাধার উদ্যেগ কাউকে না কাউকে নিতে হয় মিজান নিয়েছেন সেই উদ্যেগ। মেজানের একটা বড় গুণ খেলোয়াড় হিসেবে তিনি সবকিছুকেই সহজভাবে নিতে পারেন তাই কাজও করতে পারেন প্রচুর। এ রকম একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা চাট্টিখানি কথা নয়, কিন্তু মিজান অর্গেনাইজ করে চলছেন। আমাকে বললেন, বাসন ভাই ম্যাগাজিন বের করবো লেখা একটা দিতে হবে। কাজের চাপে এখন আর লেখা হয় না কিন্তু আমার স্কুলের পুর্নমিলনীর ম্যাগাজিন বলে কথা। মিজানের কথামত লিখতে শুরু করলাম।
লিখতে বসে কত কথা মনে পড়ছে। মানুষ গড়ার কারিগর স্যারদের কথা মনে পড়ে আমার মত গাধাদের তারাইতো দ্বিপদ পশুর কাতার থেকে তুলে এনেছেন। তাদের অনেকেই আজ বেঁচে নেই, আর কেউ বেঁচে থাকলেও তাদের সাথে আমাদের যোগাযোগ নেই। কিন্তু স্মৃতির পাতা থেকে মুছে যাননি আব্দুর রাজ্জাক স্যার। বিজ্ঞানের শিক্ষক উনার একটা বিশেষণ ছিলো সবাই তাকে এক বিশেষ নামে চিনতেন নানা বোধ হয় কেউ ভুলে যাননি। অংকের স্যার শৈলেশ বাবু, স্যার সাইকেল চালিয়ে স্কুলে আসতেন, সাইকেল চালানো অবস্থায় স্যারকে আদাব দেয়া বারণ ছিল। এর কারণ যারা জানেন না, না থাক নাই বা বললাম। স্যার তবুও আদাব দিতেন কেউ কেউ। ইংরেজি শিক্ষক চেরাগ আলী স্যার। সাদা পাজামা-পাজ্ঞাবী আর টুপি পরে আসতেন, আমরা মস্তক না ঢাকলে বেত খেতাম। জোহরের নামাজ ছিল বাধ্যতামূলক। ক্লাস টেনে আমাদের শ্রেনী শিক্ষক ছিলেন আব্দুল মান্নান স্যার। মান্নান স্যারের সাথে তার গ্রাত্র বর্ণের একটা বিশেষণকে কে বা কারা লাগিয়েছিলেন ওটা না বললে মান্নান স্যারকে চেনা যেতনা, কারণ ধর্ম শিক্ষক ছিলেন আরেক স্যার যার গাত্রবর্ণ ছিল ফর্সা। বাদাম ভাজা, নানা বা স্যারদের অন্যান্য পদবি যারা দিয়েছিলেন তাদের রসবোধ কতটুকু প্রখর ছিল তা গবেষণা করে বের করা এখন সম্ভব না তবে তারা কোন স্যারের নামের সাথে যুথসই একটা পদবি জুড়ে দিয়েছিলেন, যা এখানে উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকলাম, কারণ অনেকে হয়তো এটা ভাল চোখে দেখবেন না, রুচির ও শালীনতার কারণটা এসে যাবে। তবে শৈশবের অনেক দুষ্টমির সাথে এও তো স্মৃতির পাতার অন্যতম সংযোজন।
সেই কবে স্কুল থেকে বেরিয়েছি ৪ দশকের কাছাকাছি। কিন্তু এখনও মনে হয় এইতো সেদিন। খেলার মাঠে হকি, বাস্কেট বল খেলা। সিলেট স্টেডিয়ামে অন্য স্কুলের সাথে প্রতিযোগীতা, মারামারি ধরাধরি।
সাইদ স্যার ইংরেজি ক্লাস নিচ্ছেন, নজরুল ইসলাম স্যার বাংলার ক্লাস নিচ্ছেন, সমদ আলি স্যার নিচ্ছেন অংকের ক্লাস। এরমাঝে ৪ দশক পেরিয়ে গেছে এটা যেন বোঝা-ই যায় না।
আমরা যখন স্কুলে পড়তাম তখন বাংলাদেশেল ইতিহাসে ঘটে গেছে সবচাইতে বড় ঘটনাগুলো। উনসত্তুরের গণঅভ’্যত্থান, সত্তুরের নির্বাচন আর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের স্কুল দারুণভাবে বিধ্বস্ত হয়েছিল। কারিগরি বিল্ডিংটি জ্বলে গিয়েছিল বোমা পড়ে। আমাদের স্কুলের পাশেই সার্কিট হাউস ও ১৯৭১ সালে ডাকবাংলোয় ছিল মিলিটারিদের আস্তানা। শুনেছি এখানে অনেককে ধরে এসে অকথ্য নির্যাতন করা হত। মিলিটারিদের ক্রস করে আমাদের স্কুলে যেতে হত, ভয় হত। বর্তমান ক্যাডেট কলেজ এবং সালুটিকর বিমানবন্দরে ছিল কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প। সেখানে বহু নারী সম্ভ্রম হারিয়ে ছিলেন মিলিটারিদের হাতে। আজ এসব নিয়ে আন্তরিকতা বর্জিত রাজনীতি হয়। দেশ স্বাধীন হবার সাথে সাথে আমরা অটো প্রমোশন পেয়ে গেলাম, স্বাধীন দেশের ৩য় ব্যাচে আমরা ম্যাটিক পরীক্ষা দিলাম। দেশ স্বাধীন হবার প্রথম ও দ্বিতীয় ম্যাট্রিক পরীক্ষায় ব্যাপকহারে নকল হল। নকলের নামে দেয়া হল গণটোকাটুকি। পরের বছরও গণটোকাটুকি হল। এর পরের বছর আমাদের পালা তখন সবকিছু নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার জন্য কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হল। মেট্রিক পাশ আমরা তখন স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে মহাবিদ্যালয়ে চলে গেলাম। সে আরেক স্মৃতি আরেক ইতিহাস।

সাবেক সুরমা সম্পাদক,কলামিষ্ট ও গবেষক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here