প্রচ্ছদ প্রবন্ধ আমার পৃথিবী

আমার পৃথিবী

309
0
আম্মা, যার সাথে আমি কথা বলি সারাক্ষণ। কখনো মোবাইল ফোনে, কখনো ফেইসটাইমে আবার কখনো বা কল্পনায়। আম্মা থাকেন বাংলাদেশে আর আমি ইংল্যান্ডে। তাই সরাসরি কথা হওয়ার থেকে তাঁর সাথে মনে মনেই কথা হয় বেশি। আম্মাকে ট্রেনে পাশের সিটে বসিয়ে গল্প করে অফিস যাই, পাশাপাশি হাঁটি, কথা বলি, হাসি, সারাদিনের ঘটনা শেয়ার করি, শপিংয়ে গেলে তাঁর যা খেতে পছন্দ তাই কিনি। কোস্টার কফি আম্মার দারুণ পছন্দ তাই আমিও স্টারবাক্স ছেড়ে কোস্টা খাই আরো কত কি !
আপনারা হয়তো আমাকে পাগল ভাবছেন, আসলেই তাই। আমি আমার মায়ের জন্য ‘পাগল’। আমি যেদিন থেকে দেশ ছেড়েছি সেইদিন থেকেই অব্যাহত আছে এই পাগলামি। আমার এই পজেটিভ পাগলামির প্রেরণাদাত্রীও তিনি। কারণ, আমার মায়ের জীবন যাপনে, কথায়-বার্তায়, চিন্তা-চেতনায় কোনও নেগেটিভিটি নেই। সর্বক্ষেত্রেই তিনি একজন পজেটিভ দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ। তাঁর কাছ থেকেই আমি পজেটিভ চিন্তার প্রথম পাঠ গ্রহণ করেছি। আজ যখন পেছনে ফিরে তাকাই, মনে পড়ে আমার যেকোনও কমপ্লেইনকে তিনি তরল করে, তাকে বায়বীয় বানিয়ে বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে বলতেন- “এখন বলতো – কেমন লাগছে ? “আসলেই তাই, তখন লজ্জাবতী পাতার মতো নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে ভাবতাম-এমন করে দৃষ্টিভঙ্গি বদলালেই তো সাদা দেখা যায় সবকিছু!
আব্বা আম্মাসহ আমরা ভাই বোনেরা।
আবৃত্তি কর্মী হিসেবে আমার যতটুকুই পরিচিতি আছে তার মূলেও রয়েছেন আমার মা । তিনিই আমার আবৃত্তি শিক্ষার প্রথম শিক্ষক। আমি তখন একদম ছোট। দুই কি তিন বছরের হবো। আম্মা আমাকে ঘুমপাড়ানি গান, ছড়া শোনাতেন। আর আমি তাঁর কাছ থেকে শুনে শুনে ছড়া মুখস্ত করে ফেলতাম। একটু বড় হওয়ার পর আব্বা আমার জন্য কলকাতার- ভারতীয় ছড়ার বই কিনে দিতেন। সেই বইগুলো ছিল খুব রঙিন। অনেক সুন্দর ছবিসহ সেই ছড়ার বই থেকে আম্মা আমাকে ছড়া মুখস্ত করাতেন। আর আমি বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করে চোখে মুখে ভাব এনে সেই ছড়াগুলো আম্মাকেই প্রথম শোনাতাম। আরেকটু বড় হয়ে যখন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, বেতারে, মঞ্চে আবৃত্তি করতে শুরু করলাম তখন আম্মাই মুখস্ত হয়েছে কি না পরীক্ষা করে দেখতেন আর বলতেন- “এই জায়গাটায় আরেকটু আবেগ দিয়ে বলতো দেখি ! ওই লাইনটা আরেকটু জোড়ালো এবং স্পষ্ট করে বললে ভালো হবে” এমন আরো অনেক কিছু।
আমরা দুই বোন এক ভাই
আমরা দুই বোন এক ভাই। চমন এবং দীপের সাথে আমার বয়সের বেশ কিছুটা পার্থক্য থাকায় আম্মা আমাকেই তাঁর পুরোটা সময় দিতে পেরেছিলেন। আমাকে সকালে স্কুলে নিয়ে যাওয়া। স্কুল থেকে নিয়ে আসা। তারপর শিশু একাডেমিতে বিকেলবেলা গানের ক্লাস, নাচের ক্লাস, শুক্রবার ছুটির দিনে আবৃত্তির ক্লাস, ছবি আঁকার ক্লাসে নিয়ে যেতেন। গান শেখার জন্য বাড়িতে রেখে দিয়েছিলেন গানের শিক্ষক। এছাড়াও আরবি শিক্ষার হুজুর এবং পড়াশুনার জন্য শিক্ষকতো ছিলেনই। প্রত্যেকের পোড়ানো শেষ হলে আম্মার কাছে আবার সব বলতে হতো। স্কুলের পড়া, হোম ওয়ার্ক, শিশু একাডেমির বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি এ সবকিছুতে আম্মা ছিলেন আমার পাশে ছায়ার মতো।
মনে পড়ে,স্কুলের পরীক্ষার সময় আম্মা সকাল থেকে স্কুলের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতেন। পরীক্ষা শেষ হলে দৌড়ে এসে আম্মাকে জড়িয়ে ধরতাম। তিনি এক এক করে সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আমায় জিজ্ঞেস করতেন। স্কুল থেকে ফিরতে ফিরতে সারাদিনের সব গল্প করতাম আম্মার সাথেই। কোন বন্ধু কি করলো ? কার সাথে বন্ধুত্ব হলো ? কার সাথে আবার ঝগড়া হলো? ঝগড়ার কারণসহ ব্যাখ্যা ! ইত্যাদি ইত্যাদি।
আমার খুব মনে পড়ে, আমার ছোট ভাইবোন ছিলোনা বলে প্রচন্ড মন খারাপ হতো।স্কুলের বন্ধুদের ভাই বোনের গল্প শুনতে শুনতে নিজেকে খুব একা লাগতো। বাসায় ফিরে আম্মার হাতে পায়ে ধরে কেঁদে কেঁদে বলতাম – আমাকে একটা ছোট ভাই অথবা বোন এনে দাও এক্ষুনি !
১৯৮৭ সাল,আমি তখন ক্লাস থ্রিতে পড়ি। হঠাৎ আব্বা আমাকে নিয়ে সিলেট ওসমানী হাসপাতালে গেলেন। তাঁর চোখ ভেজা। আম্মা হাসপাতালের কেবিনে শুয়ে অঝোরে কাঁদছেন । আমি ছোট্ট একটা মানুষ, সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে আছি অথচ কেউ আমাকে কিচ্ছু বলছেন না। তাঁরা কেন এতো কান্না করছেন আর কেনই বা সকলের এতো মন খারাপ বুঝতে পারছিলাম না। আম্মা তখন আমায় বুকে টেনে নিয়ে বললেন- “তোর জন্য একটা ভাই এসেছিলো। কিন্তু সে আল্লাহর কাছে আবার ফেরত চলে গেছে রে! “আমার ছোট্ট বুকটা তখন কেঁপে উঠেছিল আর হাউমাউ করে কান্না জুড়ে দিয়েছিলাম। আমি একটিবারের জন্য ভাইয়ের ছোট ছোট হাত পাগুলো দূর থেকে দেখেছিলাম! সেই দেখাটা যেন আজও আমার চোখে রয়ে গেছে! আম্মা আমায় জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেছিলেন- ইমন তুই মন দিয়ে লেখাপড়া কর, ভালো আর সুন্দর হয়ে থাক, তাহলে তোর ভাইটা আবার তোর কাছে ফিরে আসবে!
আমি তখন থেকে দিনরাত আরো ভালো হওয়ার চেষ্টায় মগ্ন থাকতাম! আম্মাকে কিছুদিন পর পর জিজ্ঞেস করতাম-তুমি কি আজ ভাইয়াকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে আসবে ? আমি আর কত ভালো হলে ফিরে আসবে ভাইয়া?
আমার পৃথিবী-২
ভাইকে ফিরে পাওয়ার প্রশ্নের অবসান হলো বোন চমনের জন্মের মধ্য দিয়ে। দুইবছর অপেক্ষার পর চমন আমাদের ঘরকে আলোককিত করলেও তাঁর অসুস্থতা, সবাইকে ফেলল মহা দু;শ্চিন্তায়। শুরু হলো আম্মার ডাক্তার হাসপাতাল আর ক্লিনিকে ছুটাছুটি। অসুস্থ বোনটিকে সুস্থ করতে ঘুম খাওয়া সবকিছুকে অনেকটা নির্বাসনে পাঠিয়ে আম্মা জারি রাখলেন লড়াই। সবার সকল আব্দার হাসিমুখে পালন করলেও আম্মা ছিলেন ক্লান্তিহীন। বোনের মাঝে আমি খোঁজে ফিরতাম হারিয়ে যাওয়া ভাইকে। সেই অপেক্ষারও ইতি ঘটলো। এক বছর পর ফিরে পেলাম হারিয়ে যাওয়া ভাইকে। আম্মার কোল আলো করে এলো দীপ! পিঠাপিঠি হওয়ায় চমন আর দীপ সারাক্ষণ একসাথে থাকে। ওদের খাওয়া, টিভি দেখা, খেলা, দুস্টুমি সবকিছু একসাথে। দুজনের জন্য দুজনের ভালোবাসার অন্ত নেই। ভাই-বোন না থাকার আক্ষেপ দূর হলেও আমার সাথে ওদের বয়সের ব্যবধান থাকায় আমি চাইলেও ওদের সেই আনন্দের ভাগ নিতে পারতামনা। ওরাও আমাকে তাদের অভিভাবক শ্রেণীর মনে করতো, যার ফলে আমি যে একা ছিলাম সেই একাই রয়ে গেলাম। এই বিষয়টি বুঝতে বিন্দুমাত্র অসুবিধে হয়নি আম্মার। তাই আমার সঙ্গে আম্মার সখ্যতা আরো বেড়ে গেলো।
আম্মা এবং আমি।
আম্মার অনেক ভালো গুণের মধ্যে একটা হলো – তিনি সব বয়সের সব শ্রেণীর মানুষের সাথে খুব ভালো মিশতে পারেন। আমার এবং আমার বন্ধুদের সাথে যখন আম্মা মেশেন তখন তাঁকে আমাদের বয়সের ছাড়া আর কিছুই মনে হয়না। আমার বন্ধু-বান্ধবদের কাছে তিনি খুবই জনপ্রিয়।
আমি আমার মায়ের বাধ্য মেয়ে। কোনোদিন তাঁর কথার বাইরে আমি যাইনি। ছোটবেলা থেকেই আমি আমার মায়ের সকল কথা মেনে চলেছি, যা আজও অব্যাহত আছে। আম্মা যা বলতেন তাই শুনতাম, যে কাপড় পছন্দ করে কিনে দিতেন তাই পরতাম। যেভাবে চুল বেঁধে দিতেন তাই ভালো লাগতো। এখনো বেশ মনে আছে, আমার গলায় ঠান্ডা লেগে যেত বলে আম্মা আমায় আইসক্রিম খেতে দিতেন না। আইসক্রিমওয়ালারা যখন তাদের ছোট ঠ্যালার গাড়ীতে করে আইসক্রিম নিয়ে দাঁড়াতো, আম্মা তখন আমায় বলতেন – তুই এই আইসক্রিম কক্ষনও খাবিনা, কি জানি কত নোংরা পানি না কি ড্রেনের পানি থেকে এসব আইসক্রিম বানায়, কে জানে! এসব শুনে আমি কখনও ওই আইসক্রিমের গাড়ী থেকে আইসক্রিম কিনে খাইনি।
আমাদের সিলেটের লতিফ সেন্টারের সামনে একটা দোকান ছিল। সেখান থেকে আম্মা আমাকে কৌন আইসক্রিম কিনে দিতেন মাঝে সাঝে। একদিন আম্মা আর আমি শপিং এ গেছি এবং শপিং শেষে বাড়ী ফেরার সময় আম্মা আমায় জিজ্ঞেস করলেন – আইসক্রিম খাবি ? তার এমন কথায় আমিতো মহাখুশি। আমার চোখ দুটো চক চক করে উঠলো! আমরা আইসক্রিম কিনলাম, রিকশায় উঠে আমি খুব অল্প অল্প করে আইসক্রিম খাচ্ছিলাম তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাওয়ার ভয়ে ! আইসক্রিম মুখের ভেতর গলছে আর আমি সেই অমৃত স্বাদ আস্বাদন করছিলাম! বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর আমাদের রিক্সা একটু ব্রেক করতেই আমার হাত থেকে আইসক্রিমটা রাস্তায় পড়ে গেলো ! আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। ছল ছল চোখে রাস্তায় পড়ে যাওয়া লক্ষ কোটি টাকা মূল্যের আইসক্রীমটার দিকে পেছন ফিরে তাকাচ্ছিলাম, আর দীর্ঘশ্বাস ফেলছিলাম; আম্মা আমার হাতটা ধরে বললেন – ভালো হয়েছে, আইসক্রিমটা খেলে নিশ্চয়ই তোর ঠান্ডা লেগে যেত, তাই সেটা পড়ে গেছে। এখন এই গরম রাস্তাটার ঠান্ডা লেগে যাবে। আমি খিল খিল করে হেসে উঠলাম।
ছোটবেলায় কোথাও বেড়াতে গেছি, সেখানে চা, নাস্তা যা-ই দেয়া হোক না কেন আর সেগুলো খাওয়ার জন্য আমাকে যতই সাধাসাধি করা হোক না কেন আম্মা যতক্ষণ না আমায় খেতে বলেছেন আমি সেগুলোর দিকে তাকাতামই না! আম্মা আমায় বলতেন- অন্যের বাসায় গিয়ে হালুম হুলুম খেতে হয়না, শব্দ করে পানি খেতে হয়না শান্ত হয়ে বসতে হয়, অন্যের জিনিস কখনো ধরতে হয়না, বড়োদের কথার উপর কথা বলতে হয়না এরকম আরো কত কত উপদেশ !
নিধি এবং আমি।
আমার সবকিছু আম্মাই পছন্দ করে কিনে দিতেন। এখনও আমার সংগ্রহে যত শাড়ী আছে, যে শাড়িগুলো পরে নিউজ পড়ি অনুষ্ঠান করি তার বেশির ভাগই আম্মার পছন্দে কেনা। শাড়ীর প্রসঙ্গ আসতেই একটা ঘটনা খুব মনে পড়ে গেলো ।আমি তখন মাত্র এস এস সি পরীক্ষা দিয়েছি। ছোটবেলা থেকে বাংলাদেশ বেতার সিলেট এ প্রোগ্রাম উপস্থাপনা, আবৃত্তি, নাটক ইত্যাদি করায় আমার ব্যাংক একাউন্টে সামান্য কিছু টাকা জমেছিল। সিনেমা, নাটকে দেখতাম চাকরীর প্রথম মাসের বেতন পেয়ে সবাই মা-বাবার জন্য শাড়ী, পাঞ্জাবী, শার্ট কিনে নিয়ে যায় সারপ্রাইজ দিতে। আমিও সেরকম একটা কিছু করব ভাবছিলাম। আমার খুব ঘনিষ্ঠ বান্ধবী শাম্মী (যে কি না সব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ) তাকে মনের কথাটা বলতেই সে বললো-‘চল’। প্রথমে সোনালী ব্যাংকে গিয়ে টাকা তুললাম। সেদিন (এখানে একটু বলতেই হয়, ওইদিন নিজেকে খুব বড় বড় লাগছিল)। তারপর আম্মার জন্য রাজশাহী সিল্কের দামী একটা শাড়ী কিনলাম। আব্বার জন্য কিনলাম একটা ফতুয়া। শাম্মীর বাসা জিন্দাবাজার, যেখান থেকে আমরা শপিং করেছি তার পাশেই। কিন্তু সে আমার সংগে আমাদের বাসায় আসলো শুধু আম্মা আব্বার খুশিমুখটা দেখার জন্য।
আমরা দুই বান্ধবী পুরোটা পথ জুড়ে কথা বলতে বলতে আসছিলাম যে, আম্মা শাড়ীটা পেয়ে কত খুশী হবেন! কি করবেন, সে রকম একটা দৃশ্যকল্পও মনে মনে এঁকে ফেলি। ভীষন একটা সারপ্রাইজ দিতে যাচ্ছি, তাই মনে মনে আনন্দে আত্মহারা আমি। বাসায় পৌঁছলাম, আম্মাকে বললাম- ‘চোখ বন্ধ কর’। শাড়ীর প্যাকেটটা হাতে দিলাম, আম্মা জানতে চাইলেন কি এটা? বললাম- খুলে দেখো! আম্মা প্যাকেটটা খুলতে খুলতে আমি বললাম-” তোমার জন্য আমার টাকায় কেনা শাড়ী।” শাড়িটা দেখে তিনি গম্ভীর হয়ে গেলেন। আমার সাথে কোনও কথা না বলেই প্যাকেটটা রেখে বিষন্ন বদনে চলে গেলেন। আমি তো ভীষণ অবাক! এ কী! সেইসাথে মনটা প্রচন্ড – খারপ হয়ে গেলো। ভেবেছিলাম আম্মা আমাকে জড়িয়ে ধরবেন, অনেক খুশী হবেন! আদর করে দোয়া করবেন। উল্টো, একটা ভীতিকর পরিবেশ তৈরি হয়ে যাওয়ায় শাম্মী ঘরের এক কোনে বসে রইলো অনেক্ষণ। বেশ কয়েকবার আম্মার সাথে কথা বলার চেষ্টা করলাম। কোনও লাভ হলো না। সেই গোমরা মুখ। কোনও কথা নেই। পরিস্থিতির কোনও উন্নতি না হওয়ায় শাম্মী চলে গেলো। আমি মনোকষ্ট নিয়ে নির্বাক তাকিয়ে থাকলাম তার চলে যাওয়ার দিকে…
 আমার পৃথিবী (শেষ পর্ব )(৩)
এভাবেই কেটে গেলো দুই -তিন দিন। অনেক অনুনয় বিনয়ের পর আম্মা স্বাভাবিক হলেন। ভয়ে ভয়ে জানতে চাইলাম শাড়ি কিনে কি আমি কোনও অন্যায় করেছি আম্মা? কেন এমন করলে তুমি আমার সাথে? আম্মা বললেন, ‘আমি কি তোকে এই শিক্ষাই দিয়েছি? যে তুই শুধু আমাদের জন্য কাপড় কিনে আনলি? দাদু, ফুফু এবং চাচি যদি জানতে পারেন এ কথা তারা কি কষ্ট পাবেন না?’ আমাকে পাশে বসিয়ে বললেন- ‘তোর টাকায় শুধু কি আমারই দাবি? তাদের কোনও অধিকার নেই? সবার জন্য যদি এই টাকা দিয়ে শাড়ী কিনে আনতে, আর সম্ভভ হলে কিছু টাকা গরীব মানুষদের দিতে তাহলে কতো ভালো হতো ভেবে দেখেছিস? যে টাকায় আমার জন্য একটি শাড়ী এনেছিস, সেই টাকায়তো চারটি সাধারণ শাড়ী কেনা যেতো? এটা করলে আমার চেয়ে বেশি খুশী আর কেউ হতোনা।’ আসলে আমি বিষয়টাকে সেভাবে ভাবিনি। মাথায়ই আসেনি এরকমটি করার কথা। আম্মাকে জড়িয়ে ধরে সেদিন বলেছিলাম- ‘ভুল হয়েছে আমার, এমনটি আর কোনওদিন হবেনা। পরদিন আম্মা আমাকে সংগে নিয়ে আরো কয়েকটি শাড়ী কিনলেন। এরপর সেগুলো দাদু, ফুফু এবং চাচিকে দিলেন। তারপর নিজের শাড়ীটি পরলেন ।
আমি, নিধি এবং আম্মা।
আসলে মায়ের কাছ থেকেই আমি জীবনকে ভীন্নভাবে উপলব্ধি করার পাঠ নিয়েছি শৈশবে। একথা বলতে দ্বিধা নেই,‘ মাতা গুরু’ বলে প্রচলিত কথাটির সার্থক উত্তরাধিকার আমি। মায়ের কাছ থেকে এভাবেই আমি জীবনকে দেখতে শিখেছি। আমার মা যদি সেদিন খুশী হয়ে আমার দেয়া শাড়ীটা পরে ফেলতেন তাহলে আমি খুশী হতাম ঠিকই, জীবনকে এভাবে দেখতে পারার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতাম! এখন নিজের জন্য কিছু কিনতে গেলেই কাছের মানুষদের কথা ভাবি। মনোভূমিতে এই ভাবনার বীজ বপন করেছেছিলেন আমার মা, সাহানা সুলতানা শেলী।
তাঁকে শুধু নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখিনি কখনো। তিনি নিজে না খেয়ে অন্যের মুখে খাবার তুলে দিতেই পছন্দ করেন বেশি। পাড়া প্রতিবেশী আত্মীয় স্বজনদের কাছে আম্মা খুবই জনপ্রিয় একজন মানুষ। এর কারন তাদের প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসা। কেউ কোনোদিন কোনো সাহায্যের জন্য এসে খালি হাতে ফিরে যায়নি আম্মার কাছ থেকে। কার মেয়ের বিয়েতে সাহায্য লাগবে, কার টিনের ঘরের ছাদ পড়ে গেছে, কার বাড়িতে টয়লেট, টিউবয়েল নেই, কার থাকার জায়গা নেই, কার বাড়ি ভেঙে পড়লো, কার শরীর খারাপ ডাক্তার দেখাতে হবে ইত্যাদি সবকিছুর দায়িত্ব যেন তাঁর নিজের কাঁধে। সেই ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি আমাদের রান্নাঘরের চুলায় চা’ এর কেটলি অনবরত জ্বলতে, খাবার টেবিলে কখনো মেহমান ছাড়া বসেছি মনেই করতে পারিনা। গ্রামের আত্মীয়ের জন্য হাসপাতালে খাবার পাঠানো, বুয়ার মেয়ের স্কুলের পড়ার খরচ, ড্রাইভারের বাবার অপারেশন এরকম আরো কত কি যে আম্মা সামাল দেন- ভাবতে অবাক লাগে।
সকলের মায়ের জায়গাটা আম্মাই যেন জুড়ে বসে আছেন। আব্বাকে প্রায়ই বলতে শুনি -‘তোর মা এই এলাকায় অথবা আমাদের গ্রামের চেয়ারম্যান প্রার্থী হলে নিরঙ্কুশ ভোটে পাশ করবেন , এটা নিশ্চিত!’ সত্যিই তাই, মাছওয়ালা, সবজিওয়ালা, বুয়া থেকে শুরু করে প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন সকলের সুখ দুঃখের খবর যেন আম্মার সিন্দুকেই ঢালতে হবে আর আম্মা সেই দুঃখগুলোর গায়ে হাত বুলিয়ে, যত্ন করে সুখে পরিণত করে দিতে পারেন, এজন্যই তাঁকে সকলের এতো পছন্দ।
একটা কথা মনে হলে খুব মজা পাই আজও। ছোটবেলায় সকলের মুখে ‘শেলী আপা’ডাক শুনে শুনে আমিও আম্মাকে শেলী আপা বলে ডাকতে শুরু করি। বিশেষ করে আব্বার কাছ থেকে শেলী ডাক শুনে শুনে আম্মাকে শেলী বলে ডাকতে ডাকতে অস্থির করে তুলতাম । এখন এসব মনে হলে একা একাই হেসে উঠি। মনে মনে, সেই ডাকটা আওড়াই। আর ফিরে যাই সেই শৈশবে। ছোট্টবেলার দিনে।
আমার প্রতিটি অর্জনেই ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন আম্মা। প্রতিটি সাফল্যের শক্তিও তিনি। ১৯৯৭ সালের কথা আজও মনে পড়ে। জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে আমি থানা, জেলা এবং বিভাগীয় পর্যায়ে বাংলা কবিতা আবৃত্তিতে প্রথম স্থান অধিকার করে যখন জাতীয় পর্যায়ে ঢাকা যাবো। তখন আমাকে নিয়ে কে যাবে ঢাকায় তৈরী হয় জটিলতা? আম্মা আব্বা দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। চমন আর দীপ ছোট, আম্মা গেলে ওদেরকেও সঙ্গে নিতে হবে।
আব্বার সরকারি চাকরি, সেইসাথে সেই সময় অফিসে কি নিয়ে তাদেরকে খুব ব্যস্ত সময় পার করতে হচ্ছিল, তাই ছুটি নেয়াটা ছিলো বেশ কঠিন। একসময় ফাইনালে অংশ নেয়ার আশাটা প্রায় ক্ষীণ হয়ে এসেছিলো। কিন্তু আম্মা ছিলেন, নাছোড়বান্দা। তিনি আব্বাকে খুব চাপ দিতে থাকেন এবং শেষপর্যন্ত ছুটির বিপাক কাটিয়ে আব্বা আমাকে নিয়ে ঢাকায় যান। সেবার আমি জাতীয় পর্যায়ে আবৃত্তিতে প্রথম স্থান অর্জন করি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমার হাতে তুলে দেন স্বর্ণপদক। আব্বা যখন আম্মাকে ফোন করে বললেন- ‘তুমি তো স্বর্ণপদক পেলে শেলী, তোমার জন্যই ইমনের এই প্রাপ্তি। তাঁর এমন কথায় চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি সেদিন। আনন্দের অশ্রুতে হয়েছিলাম সিক্ত। আমারও ঠিক এই কথাটাই মনে হচ্ছিলো। এরপর যে ক’বার জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে গেছি আব্বা আমায় অনায়াসেই নিয়ে গেছেন, তাঁর শত ব্যস্ততা সত্বেও।
আমি যখন ইডেন কলেজে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে মাস্টার্সে পড়ি তখন আমাদের বিভাগীয় প্রধান তাহমিনা ম্যাডামের নেতৃত্বে আমাদের ব্যাচের মেয়েরা দার্জিলিং যাবে বলে ঠিক হলো। অনেকেই পাসপোর্ট বানাতে দিচ্ছে, প্ল্যানিং চলছে দারুণভাবে,ডিপার্টমেন্টে যেনও এক উৎসব মুখর পরিবেশ। আমি বাসায় এ নিয়ে কোনো কথা বলিনি। আমার ধারণা ছিলো এভাবে কখনোই যেতে দেয়া হবেনা আমায় । স্বাধীনতা অনেক পেয়েছি। কিন্তু অতটা চাওয়াটা বোধয় ঠিক হবেনা? তা ভেবে দার্জিলিংয়ের ব্যাপারে কথা বলে, আম্মা আব্বাকে বিব্রত করতে চাইনি। এদিকে, সময় ঘনিয়ে এসেছে। বন্ধুরা সবাই ধরেছে আমাকে যেতেই হবে। কলেজ থেকে সবাই একসাথে পাসপোর্ট জমা দেবে ইন্ডিয়ার ভিসার জন্য। ঠিক তখন ইচ্ছে করেই আমি সিলেট চলে আসি। বন্ধুরা আমার জন্য শেষ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করে বাসায় ফোন দিলো। আমি সেদিন বাসায় ছিলাম না বলে আম্মার সাথেই কথা বললো তারা। বাসায় ফেরার পর আম্মা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন – তুই দার্জিলিং এর ব্যাপারে কিছুই তো বললি না । তোর বন্ধুরা ফোন দিয়েছিলো, বললো আজই পাসপোর্ট জমা দেয়ার শেষ দিন। কি করলি এটা? কত মজা হতো গেলে! এই সুযোগ কি আর কোনোদিন আসবে?’ আমি আম্মার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম অনেক ক্ষণ। বললাম – তোমরা কি সত্যি আমায় যেতে দিতে ? এভাবে তো কোনোদিন যাইনি আমি! আমি এমন কিছু আবদার করতে চাইনা যা তোমাদের অস্বস্তিতে ফেলে । তাই কিছু বলিনি ।’ আম্মা বললেন – ‘এই ছাত্রজীবন আর কোনোদিন পাবি না রে মা! যে সময় চলে যায় সে সময় আর ফিরে পাওয়া যায়না! আমাদের সময় এগুলো ছিল না, আমরা অনেক কিছুই করতে পারিনি, অনেক শখই অপূর্ণ থেকে গেছে। আবার অনেক ইচ্ছেকেই তো মাটিচাপা দিয়েছি! তোরা তো এ কালের মানুষ । এই দার্জিলিং ট্রিপটা তোর জীবনে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়ে যেত, এমন সুন্দর মুহূর্তগুলো হারানো ঠিক হয়নি। আমি যা পারিনি, আমার জীবনের না পাওয়াগুলো যেন দ্বিগুন তিনগুন শতগুন প্রাপ্তি হয়ে আমার সন্তানদের মধ্যে পূর্ণতা পায়! সেটা আমি মনেপ্রাণে চাই।’ সত্যি বলতে কি, আম্মাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছিলাম আমি সেদিন। আজ আফসোস হয়, সব কথাই তো আম্মাকে বলতাম, এটা কেন বলিনি? কতোনা মজা করেছে বান্ধবীরা। আম্মাকে বললে সেই আনন্দ থেকে বঞ্চিত হতে হতো না আমাকে।
আমার নানা নানু, খালা মামারা সবাই লন্ডনে থাকার সুবাদে আমার নানুবাড়ি বলতে টোয়েনবি স্ট্রিটের নানুর ফ্লাটটাকেই বুঝতাম। ছোটবেলায় আম্মার সাথে যে ক’বার লন্ডনে এসেছি আম্মাকে দেখেছি কেমন এক ছোট মেয়ে হয়ে আমার নানুর কোলে ঝাঁপিয়ে পড়তে। আর নানু মায়া আর মমতায় আম্মাকে জড়িয়ে ধরে রাখতেন। শুধু তাই নয়, খালা আর মামাদের আদরে নিজেদেরকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে হতো। বাংলাদেশে একসময় আমার নানু শিক্ষকতা করতেন। তাঁর চলায় ফেরায় কথায় বার্তায় অন্যরকম এক দ্যুতি ছড়াতো যেন। বিচক্ষণতার জন্য লন্ডনেও দেখেছি নানুর কাছ থেকে অনেককে বিভিন্ন পরামর্শ নিতে। এক কথায় যেখানে যেতেন সেখানেই তিনি মধ্যমনি হয়ে থাকতেন। আমার আম্মা তাঁর যোগ্য উত্তরসূরি। এভাবেই মায়ের কোলে মায়ের জন্ম হয় l
২০০৩ সালে বেডফোর্ডশায়ার ইউনিভার্সিটিতে পড়াশুনার জন্য আমি লন্ডন চলে আসি। প্রতিটি দিন আমি আম্মাকে অনুভব করতাম, তাঁকে খুব খুব মিস করতাম। করতাম’ বলছি এই কারণে যে প্রকৃত অনুভব কাকে বলে সে আমি বুঝতে পেরেছি ২০০৭ সালেই। আমার মধ্যে অন্য এক আমিকে আবিষ্কার করলাম। আমি মা হচ্ছি, প্রতিদিন একটু একটু করে আমার সন্তান আমার ভেতর বড় হচ্ছে। আমার প্রতিটি নিস্বাসে অনুভব করছি আম্মাকে। নয়মাসের সেই অভিজ্ঞতায় সত্যিকার অর্থেই অনুভব করেছি আম্মাকে। ভাবতাম, আমি যখন আম্মার গর্ভে ছিলাম আম্মারওতো একই রকম কষ্ট হয়েছে । কত যন্ত্রনা তিনি সহ্য করেছেন। এসব ভাবতে ভাবতে চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়তো! পৃথিবীর প্রতিটি মা তাঁদের সন্তানকে গর্ভে ধারণ করে প্রকৃতপক্ষেই মা’কে অনুভব করতে পারেন। সেইসময় এই সময়ের মতো এত সুযোগ সুবিধা ছিলো না। অনেক কিছু না থাকার সময়ে কষ্টটাওযে অধিক ছিলো, তা উপলব্ধি করতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয়নি আমার।
আমার মেয়ে নিধি এবং আমি।
আমার সকল বিপদেই ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন আম্মা। সবার আগে এসে আমার পাশে দাঁড়িয়ে দুঃখ ভোলার মন্ত্রে উজ্জীবিত করেন আমায়। সেবারও এর ব্যতিক্রম হলোনা। যথরীতি আম্মা লন্ডন চলে এলেন। আম্মাকে জড়িয়ে ধরে সেই সময়টায় শুধুই কাঁদতাম আর বলতাম – এখন বুঝতে পারি তোমায় কত কষ্ট দিয়েছি আমি।।আম্মা তখন আমার মাথায় হাত বুলিয়ে সাহস জোগাতেন। তাঁর অগাধ ভালোবাসা আর সাহসে ২০০৮ সালে আমাদের ঘর আলো করে আসলো মামনি নিধি। সারাদিন তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। নিধিকে যখনই আমার আম্মা আমার আম্মু, আমার মামনি বলে ডাকতাম তখন আম্মা দৌড়ে এসে বলতেন – ‘ডেকেছিস আমাকে ?’ আমি তখন হেসে কুটি কুটি…! ‘আম্মা তোমাকে নয় আমি নিধিকে ডেকেছি।’
এভাবেই মায়েদের জন্ম হয়, আর তার অনুভব হয় গভীর থেকে গভীরতর! নিধির প্রতিটি কর্মকান্ডে আমার ছোটবেলাকেই আমি দেখতে পাই! মুনিরা আর নিধির মাঝে আমি শেলী আর ইমনকেই দেখি বিস্ময়ে!