প্রচ্ছদ সাক্ষাৎকার ‘স্বাধীনতার চেতনা ধারণ করায় আমাকে চারবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে’

‘স্বাধীনতার চেতনা ধারণ করায় আমাকে চারবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে’

237
0
SHARE
সিফাত বিনতে ওয়াহিদ: ১৯৭১ সালে আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করা ছাড়াও আপামর বাঙালি জাতি অংশ নিয়েছেন নানাভাবে। অস্ত্র হাতে রণক্ষেত্রে যেমন অংশ নিয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা, মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করে কিংবা নানা রকম সাহায্য-সহযোগীতার মাধ্যমে অথবা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে গান-কবিতা-দেশের সংবাদ প্রচার করেও অনেকে অংশ হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে। হাসান ইমাম তেমন একজন যোদ্ধা। যুদ্ধ চলাকালীন সময় সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নিমিত্তে বিক্ষুব্ধ বাঙালি শিল্পী সমাজকে যারা সংগঠিত করেছিলেন, তিনি তাদের মধ্যে অন্যতম একজন।
সৈয়দ হাসান ইমাম যেমন একজন দেশ বরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, গুণী অভিনেতা, নির্মাতা, তেমনই একজন শক্তিমান সংগঠকও। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তিনি ছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সাহসী শব্দসৈনিক। গান গাইতেন, দরাজ কণ্ঠে করতেন আবৃত্তি। সালেহ আহমেদ ছদ্মনাম নিয়ে পাঠ করতেন সংবাদ। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ঘুরে ফিরেছেন ব্যারাকে ব্যারাকে, ক্যাম্পে, আশ্রয় শিবিরে। দেশ স্বাধীনের পর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংকটে, পথ দেখিয়েছেন মুক্তির। অপশক্তি রুখতে হেঁটেছেন শুভবোধ চেতনার পথে। বছর ঘুরে আবার এলো বিজয়ের মাস। বিজয়ের মাসে প্রিয়.কম এর সঙ্গে কথা হলো গুণী এই সাংস্কৃতিক ব্যক্তির।
১৯৭১-সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের লক্ষ্যে আপনারা গড়ে তুলেছিলেন প্রতিবাদী সংগঠন ‘বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ’…
সৈয়দ হাসান ইমাম:  আমি ছিলাম আহ্বায়ক। ছায়ানটের ওয়াহিদুল হক এবং বুলবুল ললিতকলার আতিকুল ইসলাম ছিলেন যুগ্ম আহ্বায়ক। বেগম সুফিয়া কামাল ছিলেন আমাদের ট্রেজারার। সেই শিল্পী সমাজে বেতারের কর্মীদের যুক্ত করা হলো। আমি সংগীতশিল্পী, যার ফলে আমাকে সেই শিল্পী সমাজের সঙ্গে কাজ করতে বলা হয়েছিল। ঐ সময় বেতার কেন্দ্রে প্রতিদিনই দেশাত্মবোধক ও উদ্দীপনামূলক গান রেকর্ড করা হতো।
 ‘বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ’ এর আন্দোলনের চাপে ৮ মার্চ থেকে পাকিস্তান সরকার বেতার-টেলিভিশনের দায়িত্ব আপনাদের হাতে ছেড়ে দেয়, কীভাবে সম্ভব হয়েছিল সে আন্দোলন?
সৈয়দ হাসান ইমাম: এটা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে। আমরা ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর কাছে গেলাম, উনি আমাদের পাঠালেন জহুরুর হক নামের তথ্য মন্ত্রণালয়ের এক সচিবের কাছে। আমরা সেখানে গিয়ে শর্ত দিলাম- বেতার-টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে আমরা অংশ নেব ঠিকই, কিন্তু সব অনুষ্ঠান আমাদের আন্দোলনের অনুকূলে হবে। কর্তৃপক্ষ সে শর্ত মেনে আমাদের হাতে বেতার-টেলিভিশনের দায়িত্ব ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল।
 ২৫ মার্চের পর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে আপনার দায়িত্ব কী ছিল?
সৈয়দ হাসান ইমাম: আমি ‘সালেহ আহমেদ’ ছদ্মনামে সেখান থেকে সংবাদ পাঠ করতাম। এছাড়াও  নাটক এবং কবিতা বিভাগের প্রধানের দায়িত্বও পালন করতে হয়েছিল।
কত তারিখ পর্যন্ত এই দায়িত্বে ছিলেন?
সৈয়দ হাসান ইমাম: আমরা ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছি। আমি ঢাকায় ফিরেছি ২০ ডিসেম্বর, ১৯৭১। তাজউদ্দীন সাহেবসহ আমাদের মন্ত্রী পরিষদ ফেরেন ২২ ডিসেম্বর।
 বাংলাদেশের প্রধান মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী সংগঠন ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’র তো আপনি একজন অগ্রপথিক।
সৈয়দ হাসান ইমাম: শহীদ জননী জাহানারা ইমাম যখন ছিলেন, সে সময় ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় সদস্য এবং ট্রেজারার ছিলাম আমি। আমার সঙ্গে সেখানে আরো ছিলেন আওয়ামীলীগের প্রয়াত মন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক, সিপিবির নুরুল ইসলাম নাহিদ- (বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী), জাসদের কাজী আরেফ, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের চেয়ারম্যান আহাদ আলী, মান্নান চৌধুরী এবং শাহরিয়ার কবির। আমরা সবাই ছিলাম কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। জাহানারা ইমামের মৃত্যুর পর আমাকে আহ্বায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
 ২০০১ সালে আপনি দেশ ত্যাগ করেছিলেন, স্বাধীনতার পক্ষের চেতনার ধারণ করেন বলেই কি দেশ ছাড়তে হয়েছিল?
সৈয়দ হাসান ইমাম: স্বাধীনতার চেতনা ধারণ করায় আমাকে চারবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। আমার বাড়িতেও একবার আক্রমণ চালানো হয়। আমাকে না পেয়ে তারা আমার মায়ের বুকে এবং ভাইদের বুকে রিভলবার ঠেকায়। শুধু তাই না, মাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করে আমার লাশ ফেলে দেওয়ার হুমকি দেয় ওরা । বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকরা আমাকে কিছুদিন দেশের বাইরে থেকে ঘুরে আসার পরামর্শ দেন। আমার তখন কানে একটা অপারেশনেরও দরকার ছিল, সেটা করানোর জন্য আমি কলকাতায় গিয়েছিলাম। কলকাতায় যাওয়ার পর ইনকিলাবসহ বেশ কিছু পত্রিকায় আমার বিরুদ্ধে খবর ছাপানো শুরু করে যে আমি দেশ ছেড়ে পালিয়েছি।
 কারা আপনাকে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছিল?
হাসান ইমাম: মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি তো বটেই, বিএনপিও এর সঙ্গে জড়িত ছিল। ১৯৯৪ সালে বিএনপি যখন ক্ষমতায়, মাষ্টারদা সূর্যসেনের জন্মশতবার্ষিকীর এক অনুষ্ঠানে যাওয়ার সময় তাদের কর্মীরা আমার গাড়িতে হামলা চালিয়ে ভেঙে ফেলে। সে সময় আমি রাস্তায় এক বাড়িতে ঢুকে আশ্রয় নিই।
প্রিয়.কম: বঙ্গবন্ধুকে হত্যার চক্রান্তের উপর রচিত আবদুল গাফফার চৌধুরীর ‘পলাশী থেকে ধানমণ্ডি’ নাটকটি তো আপনি নির্দেশনা দিয়েছিলেন। দেশের বাইরে তো বোধহয় মঞ্চস্থ হয়েছে…
সৈয়দ হাসান ইমাম: যুক্তরাজ্যের লন্ডনে এবং নিউইয়র্কে দুবার নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। বেশিরভাগ স্থানীয় শিল্পীদের দিয়েই অভিনয় করিয়েছিলাম, তবে বঙ্গবন্ধু চরিত্রে পীযুষ আর বেগম মুজিব চরিত্রে আমার স্ত্রী লায়লা হাসান অভিনয় করেছিল।
 যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রে নাটকটি মঞ্চায়িত হয়েছে, আমাদের দেশে কেন এখনো প্রদর্শিত হয়নি?
সৈয়দ হাসান ইমাম: নাটকটা চার ঘন্টার, আমি গাফফার চৌধুরীকে বলেছিলাম কিছুটা সংক্ষিপ্ত করার জন্য, যদি এটা ২ ঘণ্টায় আনা যায় তবে আমাদের দেশেও এটা নির্মাণ সম্ভব হতো।
এবার একদমই ব্যক্তিগত প্রশ্ন করি, এত এত পরিচয় আপনার- জীবন নিয়ে অতৃপ্তিবোধে ভূগেন, কিংবা আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে?
সৈয়দ হাসান ইমাম: মোটেও না। আমি তো মনে করি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য না থাকার কারণে আমার বন্ধু ভাগ্য ঈর্ষনীয়। আমি কোনোদিন পেশাগত কারণে কারোর সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছি বলে আমার মনে পড়ছে না। দ্বন্দ্ব থাকতো যদি আমার কিছু হওয়ার চেষ্টা বা আকাঙ্ক্ষা থাকত, সেটা আমার আগেও ছিল না, এখন তো প্রশ্নই উঠে না। যখন যে এসে কোনো পদ বা কোনো কিছুই ছেড়ে দিতে বলেছে, আমি ছেড়ে দিয়েছি। কারো সঙ্গেই আমার কোনো প্রতিযোগীতার সম্পর্ক ছিল না, নেই। আর তা ছাড়া জীবনে না চাইতেই তো অনেক কিছু পেয়েছি। মানুষের এত এত ভালোবাসা আমার জন্য, আমার আর কী-ই বা চাওয়ার থাকতে পারে বলো তো? এই ভালোবাসার ঋণ-ই তো আমি শোধ করতে পারব না কোনোদিন।

সূত্র: প্রিয় কম