প্রচ্ছদ ফিচার সোশ্যাল নেটওয়ার্ক : নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে প্রথমে

সোশ্যাল নেটওয়ার্ক : নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে প্রথমে

762
0
SHARE
নাসিমা বেগম: সোশ্যাল নেটওয়ার্ক সারা পৃথিবীকেই আজ এনে দিয়েছে হাতের মুঠায়। সেই সাথে আধুনিক মানুষকে পরিণত করেছে ভার্চুয়াল মানুষ। ফলে বদলে যাচ্ছে আমাদের চিন্তা-ভাবনা, সম্পর্ক, জীবনের লক্ষ্য। এর সুফল আমাদের বিমোহিত করে। কিন্তু সচেতন না হলে এ সুবিধাই আমাদের জন্য হয়ে উঠতে পারে ভয়ঙ্কর বিপদের কারণ
হঠাৎ খবর শুনে চমকে উঠলেন বাবা। মেয়ে বাসা থেকে পালিয়ে গেছে! অথচ মেয়েকে ভালোভাবে বুঝিয়ে বাবা-মা দু’জনই কর্মক্ষেত্রে গিয়েছিলেন; ঘরে ছিল শুধু ছোট ভাই। ভাইটি বাথরুমে গেছে এমন সময় মেয়ে ঘর থেকে চলে গেছে। অনেক সুখের সংসার ছিল তাদের। অতি শান্ত স্বভাবের মেয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। বাবা একটি ভালো পরিবারের সাথে মেয়ের বিয়ের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করছেন। এমন সময় মেয়েটি ফেসবুকে পরচিয়ের সূত্র ধরে রায়হান নামে এক ছেলের সাথে চলে যায়। বাবা খোঁজ নিয়ে দেখলেন, ছেলেটি তার মেয়েকে ফেসবুকে যেসব তথ্য দিয়ে বন্ধুত্ব করেছে, সবগুলো তথ্যই ছিল মিথ্যা। অসত্য তথ্য ফেসবুকে দিয়ে কিভাবে একটি মেয়েকে প্রতারণা করল। বাবার আফসোস, তার এত শান্ত সোনার টুকরো মেয়েটি প্রতারণার জালে পড়ে নষ্ট হয়ে গেল। কে আবিষ্কার করল এই ফেসবুক? এই আবিষ্কারের জন্যই তো আমার মেয়ের এতবড় সর্বনাশ হলো!
আবিষ্কারের দোষ নয়, দোষ ব্যবহারের। সুদূর অতীতে যোগাযোগের মাধ্যম ছিল কবুতর। পরবর্তীকালে ডাক বিভাগে চিঠিপত্র আদান-প্রদানের মাধ্যমে যোগাযোগের পরিধি বিস্তার লাভ করে। কালের বিবর্তনে এই যোগাযোগ আজ আরো আধুনিক থেকে আধুনিকতর হয়েছে। যেমন- ফেসবুক, টুইটার, ভাইবার, ম্যাসেঞ্জার, ইমো ও হোয়াটসআপ প্রভৃতি।
ফেসবুক-সামাজিক নেটওয়ার্ক
বিশ্বায়নের এ যুগে পৃথিবী আজ হাতের মুঠোয়। সামাজিক নেটওয়ার্ক বা সোশ্যাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সারা পৃথিবী এখন এক ছাদের তলায়। ফেসবুক হলো সামাজিক নেটওয়ার্ক সাইট। এর একজন ব্যবহারকারী তার সব বন্ধুদের সাথে তথ্য, ছবি, ভিডিও প্রভৃতি শেয়ার করতে পারেন। এর মাধ্যমে নিজের ভালো-মন্দ, আনুষ্ঠানাদি, বিয়ের খরব ইত্যাদি হাজারো বিষয়ের তথ্য, ছবি কিংবা ভিডিও বিনিময় করতে পারা যায়। ফলে এর মাধ্যমে বদলে যাচ্ছে আমাদের দৈনন্দিনের জীবনের সম্পর্ক, চিন্তা ও লক্ষ্য। প্রিয় মানুষের সাথে যোগাযোগ সহজ করে দিয়েছে। সেই সাথে আধুনিক মানুষকে পরিণত করেছে ভার্চুয়াল মানুষে। অনেকেই নিজেকে বানিয়ে তুলছে ইন্টারনেট জগতের বাসিন্দা। অনেক চেনা-অচেনা মানুষই চলে আসছে বন্ধুর তালিকায়।
ফেসবুক বন্ধুকে অনেকে সত্যিকারের বন্ধু বলে মনে করে এবং ফেসবুকের মাধ্যমে একজন আর একজনের কাছে তথ্য পাঠানোকেই বন্ধুত্ব বলে বিবেচনা করে। কিন্তু সত্যিকারের বন্ধুত্ব অনেক গভীর, অনেক বেশি আন্তরিক, অনেক বেশি বাস্তব। কাজেই তথ্যপ্রযুক্তির বন্ধুত্বকে সত্যিকারের বন্ধুত্ব মনে করে কেউ যদি তাতে খুশি হয় তার ক্ষতির দিকটা বিবেচনায় নেয়া দরকার। তা না হলে ক্ষতি হওয়া অসম্ভব নয়।
ফেসবুক এমন মাধ্যম যার সুবিধা বলে শেষ করা যাবে না। কিন্তু এই সুবিধা অনেক সময়ই মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে, মেয়েরা অনেক ক্ষেত্রেই হয়রানির শিকার হতে পারে। অপরচিত কেউ রাত-দুপুরে কল দিতে পারে। অনেক সময় কোনো অনুমতি ছাড়াই বিভিন্ন গ্রুপে অ্যাড করে নিচ্ছে। কেউ আবার নিজের নামে পেইজ খুলে ইনভাইট করছে, ছবি বা স্ট্যাটাসের নিচে আপত্তিকর লিংক পোস্ট দিচ্ছে। এসব সমস্যায় সবাই কম-বেশি ভুক্তভোগী। তবে নিজেকে নিরাপদ রাখার জন্য কিছু সতর্কতা অবলম্বন করাও জরুরি।
এক. কাউকে ফ্রেন্ডলিস্টে জায়গা দেয়ার আগে তার প্রোফাইলটা দেখে আসা, অচেনা কাউকে বন্ধু না করা।
দুই. নিজের পাসওয়ার্ড স্ট্রং করে রাখা। তিন. ট্যাগ অপশন বন্ধ রাখা। চার. ব্যক্তিগত কোন পোস্ট পাবলিকলি শেয়ার না করা। পাঁচ. পারসোনাল ইনফরমেশনের (অর্থাৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মস্থলের নাম ফোন নম্বর ইত্যাদি) ক্ষেত্রে প্রাইভেসি মেন্টেন করা।
ফেসবুকের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক-গবেষণালব্ধ
ফেসবুকের ইতিবাচক দিক আছে কিনা; থাকলে সেগুলো কি ধরনের এবং নেতিবাচক দিক আছে কিনা; থাকলে সেগুলো কি ধরনের। সর্বোপরি ফেসবুক ব্যবহারের নেতিবাচক বা ইতিবাচক কোন প্রভাবটি বেশিমাত্রায় দেখা যায়। ফেসবুকের ইতিবাচক দিকের প্রাপ্ত তথ্য থেকে দেখা যায়, শতকরা ১৭ দশমিক ৫০ শিক্ষার্থী বলেছেন, বিশ্বের খবর রাখা যায়। শতকরা ১৫ জন বলেছেন, ফেসবুক ব্যবহারের মাধ্যমে একাকীত্ব দূর হয়। শতকরা ১৮ দশমিক ৭৫ জন বলেছেন, ফেসবুক ব্যবহারের ফলে বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রম সম্পর্কে জানা ও এসব কার্যক্রমের সাথে জড়িত হওয়া যায়। নিজের সম্পর্কে শেয়ার করা যায় বলেছেন ২৮ দশমিক ৭৫ জন। শতকরা ৪৬ দশমিক ২৫ জন বলেছেন, ফেসবুক স্বল্পব্যয়ে যোগাযোগের একটি মাধ্যম। এ ছাড়া পুরনো বন্ধু-বান্ধব খুঁজে পাওয়া যায় বলেছেন শতকরা ৩২ দশমিক ৫০ জন। বন্ধু-বান্ধবদের খবর পাওয়া যায় বলেছেন শতকরা ৩৫ শিক্ষার্থী। ফেসবুকের নেতিবাচক দিকের প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছেÑ শতকরা ২২ দশমিক ৫০ জন উত্তরদাতা বলেছেন, ফেসবুক ব্যবহারের ফলে সময়ের অপচয় হয়। ফেসবুক পারিবারিক জীবনে অশান্তি আনে বলে জানিয়েছেন শতকরা ১৩ দশমিক ৭৫ শিক্ষার্থী। শতকরা ২২ দশমিক ৫০ শিক্ষার্থী ঋধশব ওউ -এর বিভ্রান্তির কথা বলেছেন। এ ছাড়া প্রতারণার শিকারের কথা বলেছেন শতকরা ২৭ দশমিক ৫০ জন। মেয়েদের ইমেজ নিয়ে নোংরামির কথা বলেছেন শতকরা ১১ দশমিক ২৫ শিক্ষার্থী। রাতে দেরিতে ঘুম হয় বলেছেন শতকরা ২৫ দশমিক ৭৫ জন, সংঘটিতভাবে ক্রাইম করার কথা বলেছেন শতকরা আট দশমিক ৭৫ শিক্ষার্থী।
কতিপয় সুপারিশ
১. ফেসবুক ব্যবহারে অনেকেই সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে, তাই প্রয়োজন ছাড়া ফেসবুক ব্যবহার না করাই ভালো।
২. ১৮ বছরের নিচে যেন কেউ ফেসবুক ব্যবহার না করতে পারে সেদিকে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি দেয়া উচিত।
৩. ফেসবুক আইডি খোলার ক্ষেত্রে ব্যবহারকারী বয়স ১৮ বছর হয়েছে কিনা তার প্রমাণ করতে ভোটার আইডি নম্বর প্রদর্শন করা। অর্থাৎ ভোটার আইডি নম্বর ছাড়া যাতে ফেসবুক আইডি খোলার কোনো সুযোগ না থাকে।
৪. ফেসবুক সহজলভ্য হওয়ার কারণে অনেকে মিথ্যা নাম বা আইডি ব্যবহার করে একাধিক অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করে থাকে। এর মাধ্যমে অনেকে প্রতারণার শিকার হয়। এই প্রতারণা রোধ করার জন্য ব্যবহারকারীরা যেন একাধিক ফেসবুক আইডি খুলতে না পারে সে ব্যাপারে আইন প্রয়োগ করা।
৫. ফেসবুক যেহেতু ১৩ বছরের কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সের লোকই ব্যবহার করে। এখানে অনেক ধরনের তথ্য থাকে বা সবার জন্য সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়; তাই ফেসবুক ব্যবহারের ক্ষেত্রে নৈতিকতা বজায় রাখা উচিত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফেসবুক ব্যবহারের নৈতিক শিক্ষা প্রদান ও এর সদ্ব্যবহারের গুরুত্ব তুলে ধরা।
৬. ফেসবুক এক ধরনের হুজুগ এবং এতে শিক্ষার্থীরা অনেক সময় ব্যয় করে থাকে। এই শিক্ষার্থীরা যেন ফেসবুকে অযথা সময় নষ্ট করে নিজের পড়াশোনার ক্ষতি না করে সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত। অর্থাৎ, একজন শিক্ষার্থীকে ফেসবুক ব্যবহারের ক্ষেত্রে আবশ্যই সচেতন থাকতে হবে, যেন ফেসবুক ব্যবহারের ফলে পড়াশোনার ক্ষতি না হয়।
৭. ফেসবুক ব্যবহারকারীর বয়স যেহেতু ১৩ ধরা হয়েছে। এই বয়সের অনেকেই তা ব্যবহার করছে, তাই কমবয়সীরা যেন প্রতারিত না হয় এবং বেশি ব্যবহারে যেন আসক্তির সৃষ্টি না করে সেদিকে পরিবারের বড়দের খেয়াল রাখতে হবে।
সোশ্যাল নেটওয়ার্ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে যুগান্তকরী উন্নতি সাধন করেছে। একথা যেমন সত্যি তেমনি এ মাধ্যম আমাদের অনেক নতুন সমস্যা ও সঙ্কটও তৈরি করেছেন। তাই সচেতন হতে হবে সবাইকে। একজন তরুণীকে যেমন সচেতন হতে হবে ফেসবুক ব্যবহারের ক্ষেত্রে তেমনি মাকেও সচেতন হবে সন্তান কি করছে সে ব্যাপারে। একমাত্র সচেতনতাই পারে এর ক্ষতি থেকে বাঁচাতে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here