প্রচ্ছদ সাক্ষাৎকার ‘সঙ্গীত আপনার হাতের মোবাইল নাকি!’

‘সঙ্গীত আপনার হাতের মোবাইল নাকি!’

162
0
SHARE
সায়ন্তন মুখোপাধ্যায়: সম্প্রতি কলকাতায় শো করতে এসেছিলেন ‘নিজামি বন্ধু’রা। ৭০০ বছরের পুরনো পরম্পরা। তবে, শিরোনামে এসেছেন ‘রকস্টার’ ছবিতে মুখ দেখানোর পরেই। কলকাতায় এসেছিলেন চাঁদ নিজামি, তাঁর দুই ভাইপো শাদাব এবং শোহরাব। শো শুরুর আগে ধরা গেল তাঁদের। চাঁদ বললেন, তিনিই কথা বলবেন। ফিল্মের মিউজিক, সুফিয়ানা, ফোক, ফিউশন, রুহানিয়ৎ— সব কিছু নিয়েই খোলামেলা আড্ডা দিলেন আনন্দবাজার ডিজিটালের সঙ্গে।

কলকাতায় এই প্রথম বার, নাকি আগেও এসেছেন?
৩৫ বছর আগে বাবার সঙ্গে প্রথম বার কলকাতায় আসা। তার পরেও প্রায় ১০-১২ বার এসেছি। আমার বাবা উস্তাদ মেহমুদ নিজামি একটা কথা বলতেন, ‘কলকাতায় কখনও প্রোগ্রাম করতে গেলে একটু বুঝে-শুনে গান গাইবে। কারণ এই শহরের মানুষ যে শুধু গান শোনেন তাই নয়, সঙ্গে গানটা বোঝেনও ভাল।’ এ বার দেখুন যেখানে শুধুই গান শোনার লোক থাকে, সেখানে যা হোক গেয়ে ফেললাম। কিন্তু, যেখানে মানুষ গানটা রীতিমতো বোঝেন, সেখানে একটু বুঝেশুনেই গান গাইতে হয়। তবে এই প্রথম বার আমি কলকাতায় পারফর্ম করব। তার পর আবার রমজান মাসে এমন একটা শো। ইনশাল্লাহ! জমে যাবে।
• বাংলায় কার গান আপনাদের ভাল লাগে?
পার্বতী বাউল। ওঁর গান আমাদের খুব প্রিয়। অনেক জায়গায় পারফর্ম করতে গিয়ে দেখা হয় ওঁর সঙ্গে। পার্বতীরও আমাদের গান নাকি ভাল লাগে।

 

রোজার সময় গান গাইলে কী স্পেশ্যাল ফিলিং কিছু হয়?
দেখুন, আমরা কাওয়াল। সুফি ঘরানার গান আমরা সাধারণত গেয়ে থাকি। আর এই ধরনের গানের পরতে পরতে থাকে রুহানিয়ৎ। গানগুলো আমাদের অন্তরাত্মা থেকে বেরিয়ে আসে। আর তাই তা অতি সহজেই মানুষের মন ছুঁয়ে যায়। তা সে রোজা হোক বা বসন্তী পঞ্চমীই হোক। আর সুফি গানের বিশেষত্বই হচ্ছে গায়ক আর শ্রোতা দু’জনেই ওপরওয়ালার সঙ্গে কানেক্ট করতে পারেন।
শুনেছি, বসন্ত পঞ্চমীর দিন নাকি বেশ জাঁকজমক ভাবেই হজরত নিজামউদ্দিন অউলিয়া দরগায় আপনারা প্রোগ্রাম করেন?
হ্যাঁ, খুব সুন্দর করে হলুদ ফুল দিয়ে আমরা পুরো দরগাটাকে সাজাই। বাচ্চা থেকে বুড়ো, সকলেই হলুদ পোশাক পরে। সে দিন একটা অন্য মহল তৈরি হয় গোটা দরগায়।
এত দিন ধরে গান গাইছেন, অথচ জনপ্রিয় হলেন ‘রকস্টার’ ছবিতে মুখ দেখানোর পর?
এটা ঠিক যে রকস্টার ছবির ‘কুন ফায়া কুন’ গানটিতে রণবীর কপূরের সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ারের সুযোগ পেয়েছি। আর তাতে মিডিয়ার নজরেও এসেছি। কিন্তু আসলে তো আমরা ৭০০ বছরের পুরনো রকস্টার। কারণ, আমাদের নামটাই জুড়ে রয়েছে হজরত নিজাউদ্দিন অউলিয়ার সঙ্গে। ওই দরগাতেই আমাদের জন্ম, বেড়ে ওঠা, আর সুফিয়ানার সঙ্গে পরিচয়। সুতরাং ‘রকস্টার’ আমরা অনেক আগে থেকেই। যদিও ওই গানটা গেয়েছেন রহমান সাহেব, মোহিত চৌহান আর জাভেদ আলি। আমরা কেবল লিপসিঙ্কই করেছি।
শুটিং চলাকালীন রণবীর কপূর নাকি আপনার কাছেই ট্রেনিং নিতেন?
রণবীর কপূর খানদানি অভিনেতা। ওঁর রক্তে অভিনয়। ওঁকে আমি আর কী ট্রেনিং দেব? দরগায় আমাকে সবাই চাচা বলে ডাকত দেখে রণবীরও চাচা বলতে শুরু করে দেয়। ১০-১২ দিন ধরে নিজামউদ্দিন অউলিয়া দরগায় শুটিং হয়েছে। দরগার ভিতর আমার গরিবখানাতেই থাকত রণবীর। ও সব সময়েই আমাদের গানের ধরনটা ফলো করত। ফলো করত আমাদের জীবনযাপনও।
ফিল্মের মিউজিক পপুলার, যেটা আপনাদের ঘরানার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এই দুটোকে ব্যালেন্স করেন কী ভাবে?
ব্যালেন্স করার প্রয়োজনই পড়ে না। কারণ, ফিল্মের গানের জন্য বলিউড থেকে আমরা খুব একটা ডাক পাই না। যেটুকু পাই সেখানে তো সুফি-কাওয়ালিই গাই। ২০০৫ সালে সুজিত সরকারের ছবি ‘ইয়াহাঁ’,  তার দশ বছর পরে ‘বজরঙ্গি ভাইজান’ এ গান গাইলাম। খুব সম্প্রতি ‘আজমগড়’ বলে একটা ছবিতে গান গেয়েছি, শীঘ্রই মুক্তি পাবে ছবিটা। আর কোন গান কখন পপুলার হবে, তা কেউ বলতে পারে না। যেমন ধরুন, ‘রস কে কমর’ গানটা কত দিন আগে নুসরত ফতে আলি খান সাহেব গেয়েছেন। সেই গান বিখ্যাত হল শুধু একটা সিনেমায় ব্যবহার হয়েছে বলে। আর আমাদের পরিচয় ফিল্মের গায়ক হিসেবে নয়। আমরা কাওয়াল, সুফি গান গেয়ে থাকি। হলিউড হোক বা বলিউড পৃথিবীর যে প্রান্তেই আমরা গাই আমাদের আসল পরিচয় কিন্তু ওই হজরত নিজামউদ্দিন অউলিয়া।
• বলিউডের সুফি গায়ক প্রয়োজন হলেই পাকিস্তানের গায়কদের ডাকেন কেন?
হিন্দিতে একটা কথা আছে না, ‘ঘর কা মুরগি দাল বরাবর’। দেখবেন, মশলাপাতি দিয়ে বাড়ির চিকেন যত সুন্দর করেই বানানো হোক না কেন, তা কারও ভাল লাগে না। রেস্তরাঁর ডাল কিন্তু অমৃতের মতো লাগে। বলিউডেও কিছুটা তাই। তবে কোন অভিনেতার জন্য কোন গায়কের গলা পারফেক্ট সে দিকটাও অনেক সময় নির্ভর করে। আর আমরা যে হেতু দিল্লিতে নিজামউদ্দিন দরগার ভিতরে থাকি, তাই মুম্বইয়ের সঙ্গীত পরিচালকদের পিছু পিছু ঘোরার সুযোগ পাই না। মুম্বইতে থাকলে বোধ হয় আরও অনেক বলিউড ফিল্মে গান গাইতে পারতাম।
তা হলে পাকিস্তানি গায়কদের ব্যান করা হলে তো আপনাদেরই আখেরে লাভ, কী বলেন?
তা হতে পারে। কিন্তু, সেই ভাবনা কখনও আমাদের মধ্যে আসেনি। আর কখনও ভাবতেও চাই না। গায়ক হয়ে গায়কদের বা সঙ্গীতের ক্ষতি আমরা করতে পারি না। তা ছাড়া গানের আবার বর্ডার কী? গান আপনার হাতের মোবাইল নাকি? যত ক্ষণ চাইবেন হাতে রাখবেন। আবার যখন ইচ্ছা পকেটে ঢুকিয়ে নেবেন। সঙ্গীত কারও নিজস্ব সম্পত্তি নয়। কেউ সঙ্গীতের নিয়ম ঠিক করে দিতে পারে না। ছোটবেলায় শোনা একটা শায়েরির কথা মনে পড়ে গেল। ‘হা’ সে হিন্দু বন গয়ে, অউর ‘ম’ সে মুসলিম, ‘হা’ অউর ‘ম’ যব মিল গ্যায়ে তব বনে ‘হাম’। সুতরাং, মিউজিকের হিন্দু-মুসলিম-শিখ-পারসি-বুদ্ধ-জৈন কিছুই থাকতে পারে না। মিউজিক ইজ মিউজিক।
আমির খুসরো বা অন্য শিল্পীদের গান ছাড়া, নিজেদের মিউজিক কি কম্পোজ করেন আপনারা?
হ্যাঁ, করি। আমরা নিজেদের জন্য গানও লিখি, কম্পোজও করি। উস্তাদ আমির খুসরো, কবীর দাস, বুল্লেহ শাহ, সুলতান বাহু— যাঁরা রুহানিয়াৎকে কলমে অন্য একটা মাত্রা দিয়েছেন, তাঁদের সকলের গানই গাই আমরা। কখনও সখনও ওস্তাদ নুসরত ফতে আলি খান সাহেবের গানও গাই।
• সুফি-কাওয়ালি দিয়েও তো ফিউশন তৈরি হচ্ছে, আপনাদের ক্ষতি হচ্ছে নাকি তাতে?
ফিউশন হচ্ছে ঠিক আছে। তাতে আমাদের কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু আসল মিউজিক হচ্ছে এ দেশের শাস্ত্রীয় সঙ্গীত। আর আমাদের মাথার উপরে আছেন হজরত নিজামউদ্দিন অউলিয়া, কে আমাদের ক্ষতি করবে। দেখছেন না বলিউডেও এখন কেমন সুফি মিউজিক নিয়ে হৈ হৈ চলছে। সুতরাং সুফি মিউজিকের বাজার কোনও দিন নামবে না। বরং বাড়বে।

কৃতজ্ঞতায়:আনন্দবাজার