প্রচ্ছদ প্রবন্ধ রমজান মাসের ভাবনা, কিছু স্মৃতি কিছু কথা

রমজান মাসের ভাবনা, কিছু স্মৃতি কিছু কথা

355
0
SHARE
আর ক’টা দিন পরেই আসছে সিয়াম সাধনার মাস পবিত্র মাহে রমজান। সে জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি চলছে সর্বমহলে। ‘নারী’ সম্পাদকও বসে নেই। তারও রমজান মাস উপলক্ষে একটা লেখা চাই। লেখাটা হবে এই পবিত্র মাস উপলক্ষ্য করে মৌসুমি মৌ-লুভি চাঁদাবাজ এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকদের সম্পর্কে। যাতে মানুষের কষ্টার্জিত পয়সাগুলো ধর্মব্যবসায়ী, ঠক, ভন্ড, সন্ত্রাসী চাঁদাবাজদের হাতে না পড়ে। যাতে এদের সম্পর্কে আমাদের ধর্মভীরু মা, ভাই-বোনরা সতর্ক হন, সচেতন হন। যাতে তারা তাদের শ্রমের-ঘামের পয়সাগুলো নিজ পরিবার পরিজনের কাজে লাগাতে পারেন। লাগাতে পারেন নিজ সন্তানদের মানুষ করার কাজে, আর্থমানবতার সেবায় অথবা সত্যিকার অর্থে জনকল্যাণমূলক কোন কাজে।
সম্পাদকের কথাগুলো শুনে মনে পড়ে গেল কবি হেলাল হাফিজের ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতার দু’টি চরণ; ‘এখন যৌবন যার/যুদ্ধে যাবার শ্রেষ্ঠ সময়।’ আমাদের ‘নারী’ কাগজের সম্পাদকেরও যুদ্ধে যাবার বয়স। বাস্তব অভিজ্ঞতা কম তাই অনেকটা বিপ্লবীও। তিনি জানেন না যাদের নিয়ে লিখতে বলেছেন তাদের হাত কত লম্বা। তিনি আরও জানেন না যে, ওরা তার মতো নৈতিক বলে বলিয়ান নয়, ওরা ভীরু ও দুর্বল। নৈতিকভাবে দুর্বল মানুষেরা সব সময় সমাজ, সংস্কৃতি বা প্রচলিত নিয়ম-কানুনকে মানে না, সম্মান ও শ্রদ্ধার চোখে দেখে না। তারা তাদের স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করে। তারা ভয় দেখিয়ে, হুমকি ধামকি দিয়ে সত্যকে, ন্যায়কে দমিয়ে রাখতে চায়। এই চর্চা আমরা অতিতেও দেখেছি, এখনও দেখছি। তাই বিনয়ের সাথে সম্পাদককে বলেছি আপনি একশ বছর এই সমাজ সংস্কৃতির জন্য কাজ করলেও এমন কি চাঁদাবাজদের কল্যাণে কাজ করলেও তাদের স্বার্থ বিরোধী একটি কথা যখন পত্রিকায় লিখবেন তখন তারা আপনার একশ বছরের সমাজকর্মকেও চিরতরে বন্ধ করে দিতে কিংবা পদদলিত করতে কুন্ঠিত হবেনা। ধর্মের দোহাই কিংবা ধর্মের মনগড়া ও ভুল ব্যাখা দিয়ে সমাজকে আপনার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতেও তাদের বিবেকে বাঁধবে না। তারা আইনের ভয় দেখাবে, টাকার জোড় দেখাবে, বল প্রয়োগের মহড়া দেখিয়ে আপনাকে হেনেস্থা করার চেষ্টা করবে। আমার কথা শুনে সম্পাদকের মন ভরেনি। বলেছেন, ফারুক ভাই ঠিক আছে তবুও একটা লিখা দিন। তাই তার মন ভরাতে আজকের আয়োজন। তাও একান্ত ব্যক্তিগত কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়ে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হবার কয়েক বছর পর বঙ্গবন্ধু সম্ভবত যৌতুকের অভিশাপ সম্পর্কে বলতে গিয়েই অমর একটি উক্তি করেছিলেন। উক্তিটি হুবুহু এখন মনে পড়ছে না। তবে তা অনেকটা এধরণের ছিল, ‘আমার দেশের ছেলেরা কবে বেলি ফুলের মালা দিয়ে তার জীবন সাথীকে বরণ করে নেবে এ আশাই আছি।’ এই কথাটি শুনে প্রথমেই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নকে বাস্তবায়নে এগিয়ে এসেছিলেন নাট্যঅভিনেতা হুমায়ুন ফরিদী। এক পর্যায়ে তাদের সেই দৃষ্টান্তমূলক বিয়েটি ভেঙ্গে যায় এবং তিনি সুর্বণা মুস্তফাকে বিয়ে করেন। বঙ্গবন্ধুর সেই অসাধারণ উক্তি শুনে যৌবনে এই অভাজনের মনেও আগুন ধরেছিল। ইচ্ছা হয়েছিল এ ধরণের বিপ্লবান্তক কিছু করার। সে জন্য আমিও আমার বিয়ের সময় ঘটককে কথাটি জানিয়েছিলাম।
১৯৮৯ সালের কথা। ঝলক ইন্টারন্যাশনাল আর্টিষ্ট কো: লি:-এর আমন্ত্রণে একটি কালচারেল দলের গীতিকার হিসেবে ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে এ দেশে আছি। এদেশে তখন আমাদের দেশীয় লোকদের ভাষায় আমি বা আমার মতো যারা, তারা ‘ভিজিটর জামাই’। সে হিসেবে আমিও ভিজিটর জামাই। সুতরাং একজন ভিজিটর লোক, তিনি যে বা যারাই হোন না কেন যুক্তরাজ্যে তখন বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হলে অন্যান্য অনেক গুণাবলীর পাশাপাশি তাকে ‘বিয়েপণ ‘ মহার্ঘ দিয়েই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হতো এবং তা অনেকটা স্বাভাবিক রীতি হিসেবে বিবেচিত ছিল। আমি যে সময়টার কথা বলছি তখন ‘বিয়েপণ’-এর অংকটা ৫ হাজার পাউন্ড থেকে ১২ হাজার পাউন্ডরে মধ্যে উটানামা করতো। কিন্তু আমার পক্ষে পাঁচ হাজার পাউন্ড তো দূরের কথা দুই/তিন হাজার পাউন্ড ‘বিয়েপণ’ দেবার সামর্থ ছিলো না। তাই ‘বিয়েপণ’ এর প্রসঙ্গ আসলেই বলতাম, ‘পণ দিয়ে বিয়ে করবো না’। এটা অনেকটা রথ দেখা কলা বেচার মতোই ব্যাপার। হাতে টাকা নাই, আর এই নাই দিয়েও যে বাহাদুরী দেখানো যায় সেই সুযোগটাও কখনও কখনও নিতাম। শেষ পর্যন্ত আমার পূর্ব পরিচিত এবং পছন্দের কনের সাথেই বিয়ে ঠিক হলো এবং ভাগ্যগুণে ‘বিয়েপণ’ ছাড়াই। কনের পক্ষ থেকে ‘বিয়েপণ’ না নেয়ার কারণ, আমাদের উভয় পরিবারের মধ্যে আগে থেকেই চেনাজানা এবং সুস্পর্ক ছিল। এই বিয়েপণ দাবী না করায় আমার বুকের পাঠা অনেকখানি বেড়ে গিয়েছিলো। বিয়ে ঠিক হবার সুযোগ বুঝে ঘটকের কাছে প্রস্তাব দিলাম যে, সোনা- গয়না সবই ঠিকমতো কেনা হোক। কিন্তু লোক দেখানোর জন্য হলে বিয়ের দিন সোনার পরিবর্তে আমি ফুলের মালা দিয়ে বধুবরণ করতে চাই। বেচারা প্রস্তাবটি শুনেতো অবাক। এমন ভাব দেখালেন যে, আসলেই আমি একটা আস্ত গন্ডমূর্খ। পারলে সজোরে গালে একটা চড় বসিয়ে দিবেন।কিন্তু মুখে শুধু বললেন, আপনি অদৌ কি লেখাপড়া করে এসেছেন? নাকি ভুলে গেছেন যে, বিয়ে ঠিক হবার দিন কতো চেষ্টা করে বাইশ ভরি সোনা দিতে আপনাকে রাজি করিয়েছি। এরমধ্যে এক রতি কম হলে চলবে না বলে হুমকি দিয়েছেন আপনার শশুড়।আপনি ফুলের মালা দিয়ে বিয়ে করবেন! খবরদার, এখন চুপচাপ থাকুন ভালোয় ভালোয় আগে বিয়েটা হোক। নতুবা প্রস্তাতে হবে। ঘটক সাহেবের কথা শুনে আমার সন্বিত ফিরে এলো। ভাবলাম ঠিকইতো চাল নেই, চুলো নেই নিধিরাম সর্দার।
যাই হোক সে দিন বিয়ের সোনা কিনতে গিয়ে রীতিমতো অবাক হবার পালা। যে শশুড় মশাই বিশ ভড়ি সোনা থেকে এক রতি কম হলে বিয়ে ভেঙ্গে দেবেন বলে তার পক্ষের মুরুব্বি নামক দলবল নিয়ে হুমকি দিয়েছিলেন, সেই শশুড় বাবাজি অন্যন্ত নরম সুরে মোলায়েম কন্ঠে অত্যন্ত বিনম্ন ভাষায় সকলকে অবাক করে বললেন-‘ আমার মেয়ে সোনা ফিনতে ভালা পায় না। বিয়া করি কথা, কিনা লাগে তাই কিনছি। সাড়ে সাত তুলা সোনা কিনলে বছর বছর যাকাত দেওয়া লাগতো নায়।আমি চাই সাড়ে সাত তুলার মাঝে আপনারা সেট পছন্দ করইন। দয়া করি আপনারা কেউ কেউরে কইবা না আমরা কত ভরি কিনছি’ শেষ পর্যন্ত তিনি সাড়ে সাত ভরির মধ্যেই একসেট সোনার গহনা পছন্দ করেন এবং আমরা সেটাই কিনি। তারপর তুলনামূলকভাবে একটু দামি দেখে একটি শাড়ি কিনে বললেন আর কেনা না কেনা আপনাদের ইচ্ছা।এরপর একটি রেষ্টুরেন্টে গিয়ে আমাদের চা পানি খাইয়ে তিনি তার দলবল নিয়ে অন্য একটি কাজের অজুহাত দেখিয়ে চলে গেলেন। আমার পক্ষের যারা ছিলেন তারা সকলেই অবাক হয়েছিলেন আমার শশুড়ের এ কান্ড দেখে। কারণ, তিনি খুব ধার্মিক নন তবে গোড়া ধার্মিকের মতো বলেছেন, ‘সাড়ে সাত ভরি হলে যাকাত দিতে হবে না।’ আমার তখন আক্ষেপ হচ্ছিল যে, ফুলের মালা দিয়ে বধুবরণের ইচ্ছেটা কোনভাবে তার কানে পৌঁছে দিতে পারলে হয়তো লন্ডনে আমিও একটা ইতিহাস গড়তে পারতাম। আরও দশজনের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারতাম। আধুনিক সভ্যতার ইতিহাসে নিজের নামটি লেখাতে পারতাম। কারণ, যে পরিমাণ সোনা দিয়ে বিয়ে করেছি এই রাজ-রাণীর দেশের বিয়ের গুরুত্ব বিবেচনায় তা বেলি ফুলের বা ফুলের মালার চাইতে কম ছাড়া খুব একটা বেশি দামী নয়।
বিয়ের দিন আমার স্ত্রীকে সে গয়নাগুলো পরানো হয়েছিলো আমি দেখেছি। কিন্তু বিয়ের পরে সে গয়নাগুলো আর পরেছেন কি না আমার মনে পড়ছে না। দেশে যতবার গেছেন তিনি তার স্বাভাবিক গয়নাগুলো পরে গেছেন। সোনার গয়না নাকি বেজায় ঝামেলা। বিয়ের কিছুদিন পরে গিন্নিকে আমার ফুলের মালা দিয়ে দিয়ে বধুবরণের যে ইচ্ছা জেগেছিল সেই কাহিনী বলায় তিনি আক্ষেপ করলেন। বললেন,’তা হলে তো অারো ভালো হতো, একটা নতুন কিছু হতো।’ এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে আমাদের বিয়ে আসবাবপত্র গয়নাঘাটির সাথে সোনার আংটিই উঠেছিল ৭০টি। আরো অনেক ধরণের উপহার সামগ্রী ছিলো যা অামরা খুলে দেখার প্রয়োজন অনুভব করিনি। এখনও বিয়ের পঁচিশ বছর চায়ের কাপ, প্লেইট ইত্যাদি অব্যবহৃত অবস্থায় প্যাকেট বন্দি আছে। প্রশ্ন হচ্ছে এই অযথা অপচয় কেন? একটি ঘরে বেশি হলে দু’টি টিভি সেটই যথেষ্ট। সেখানে চারটি হলে অন্যকে বিলিয়ে দেয়া ছাড়া আর কি করার আছে? ঠিক তেমনি ফ্রিজ, ফ্রিজার, ফ্যান, মাই্ক্রওয়েভ ইত্যাদির বেলায় এক-ই কথা বলা চলে। অনেকের ঘরে নতুন আসবাবপত্র থাকে। সেখানে ছেলের বিয়েতে যদি অারো এক সেট চলে অাসে সেগুলো রাখবেন কোথায়? যাই হোক আমাদের বিয়েতে উপহার হিসেবে পাওয়া আংটিগুলো পরে আমরা বিভিন্ন বিয়েতে উপহার হিসেবে দিয়েছি। অথচ এই ৭০টি আংটি যারা দিয়েছিলেন তারা যদি এর পরিবর্তে নগদ পাউন্ড দিতেন তা হলে সেই দুর্দিনে গরীবের ‘ভিজিটর জামাই’র বেশ উপকার হতো।
বিয়ের পর অামি আর আমার স্ত্রী প্রতিক্ষা করেছিলাম, যে যাই বলুক কোন বিয়েতে গেলে আমরা নগদ টাকা ছাড়া কোন ধরণের গিফট নেবো না। এছাড়া এই থিয়োরিটি আমরা প্রথম প্রয়োগ করি আমার শালার বিয়েতে। আমি আমার স্ত্রী প্রস্তাব করেছিলাম তার শশুড় বাড়ি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনকিছু নেবো না।কিন্তু আমার শাশুড়ি সে প্রস্তাবে রাজি হননি। পরে আমরা সিদ্ধান্ত নেই আমাদের অাত্বীয় -স্বজনকে বলবো তারা যদি বিয়েতে গিফট দিতে চান তাহলে যেন নগদ পাউন্ড দেন। হোক তা পাঁচ কিংবা দশ পাউন্ড। কোন ধরণের বক্স গিফট দেয়া যাবে না এবং একেবারে কিছু না দিলে আমরা আরো খুশি হবো। প্রস্তবটি শুনে আমার শাশুড়ির চক্ষু চড়কগাছ। ব্যাটা বলে কী? আমাকে বললেন ‘বাপু এতে কি আমাদের মান-সম্মান কিছু থাকবে?’ আমি তখন সাবিনয়ে বলেছিলাম, দোষটা আমি আমার ঘাড়েই নিচ্ছি। শশুড়ের মৌন সম্মতি ছিল তাই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তেমন অসুবিধে হয়নি। ফলাফল হলো বিয়েতে আমাদের পক্ষে নগদ সালামি সাড়ে তিন হাজার পাউন্ড আসে। ওদিকে তার শশুড় বাড়ী থেকে আসে আর দুই হাজার পাউন্ড। অর্থ্যাৎ সাড়ে পাঁচ হাজার পাউন্ড। বিয়ে করে ঘরে আসার পরে আমরা হানিমুনের জন্য সে টাকা তার হাতে তুলে দিতে পেরেছিলাম। এই কাজটা সেদিন অনেকের পছন্দ হয়। অনেকেই উজ্জীবিত হন। মূলত তারপর থেকেই এই রীতি আমাদের আত্বীয়-স্বজনদের মধ্যে চালু হয়ে যায়। এর কয়েক বছর পর লন্ডন থেকে প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক পত্রিকা’তে বিয়েতে নগদ টাকা উপহার দেয়ার জন্য উৎসাহিত করে বিজ্ঞাপণ প্রচার হতে থাকে। অনেকে এ নিয়ে হাসি-তামাসাও করেন। তবে বেশির ভাগ ভাগ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। বর্তমানে এই একবিংশ শতকের প্রথম দশকে ব্ক্স গিফট দেয়ার প্রচলন উঠে গেছে একেবারে। যে রীতি যুগ যুগ ধরে চলে আসছিল তা পরিবর্তনে সময় লেগেছে মাত্র এক থেকে দেড় দশক।
এবার রমজান মাসের কথায় আসা যাক। এই পবিত্র মাস আসার অাগ থেকেই আমরা নানা ধরণের সংস্কার কিংবা কু-সংস্কার চর্চার প্রস্তুতি শুরু করে দেই। রমজান মাস সিয়াম সাধনার মাস হলেও আমরা আমাদের জীবনচারণে বরং উল্টোটাই করি। বিশেষ করে খাবারের বিষয়ে। প্রায় প্রত্যেকটি ঘরে কম হলে ৭/৮টি আইটেম থাকে শুধু ইফতারের সময়। সেগুলোর বেশির ভাগ আইটেম থাকে তেল অথবা ঘিয়েভাজা। বাংলাদেশে রেস্তোরাগুলোতে যে তেলে ইফতার ভাজা হয় তা কত দিনের পুরোনো আল্লাহ মালুম। তবে লন্ডনের রেস্তোঁরাগুলোতে তা কম হলেও ৩/৪ দিনের পুরোনো তাতো বলাই বাহুল্য। পরিসংখ্যান নিলে সম্ভবত এমন কোন বাঙালী পরিবার খুঁজে পাওয়া যাবে না যে পরিবারে অন্তত একজন হার্টের রোগী এবং দুই তিন জন ডায়বেটিকস রোগী নেই। ডাক্তারের নিষেধ অমান্য করে রমজান মাসে তারা ডাক্তারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে সে খাবারগুলো খেয়ে থাকেন। এ ক্ষেত্রে অনেক ইমাম ফতোয়া দিয়ে বিষয়টাকে আরও উস্কে দেন এ বলে যে, ‘রমজান মাসে যা খাওয়ার হিসেবে নাকি আল্লাহ নেবেন না’। তাই বিশেষ করে বাংলাদেশে রমজান মাস এলেই দেখা যায় তেল, চানা, ডাল, বেগুন ইত্যাদির দাম হু হু করে বেড়ে যায়। কারণ ইফতারি তৈরিতে এগুলো চাই। কিন্তু কেন? উত্তরটা আমরা কেউ কি কখনো নিজেদের কাছে প্রশ্ন করেছি? আমরা কেউ কি এগুলো না খেয়ে বরং স্বাভাবিক খাদ্যগ্রহণ করে দেখেছি যে এতে কোন লাভ বা ক্ষতির আছে কি নেই।
পাঠক, এ বিষয়ে আমিএকটি বাস্তব অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চাই। আমি একজন রেষ্টুরেন্টকর্মী। আমার দুই দশকের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, রমজান মাসে যে কোন রেঁস্তোরার স্টাফদের মধ্যে যে খাদ্য তৈরীর যে মহড়া চলে, তা দেখলে আপনিও অবাক হবেন। অথচ ইফতারের পর এগুলো চলে যায় ডাস্টবিনে। যুক্তরাজ্যে অধিকাংশ রেঁস্তোরাগুলোতে একই অবস্থা। রমজান মাসে অনেকের পেটে অসুখ হয়। এ ক্ষেত্রে সব সময় ব্যতিক্রম আমাদের ম্যানাজার জনাব আব্দুল মুহিত সোহেল। রমজান মাসে তার কোন ধরণের পেটে পীড়া হয়না। আমরা নানা ধরণের বাহুল্য জাতীয় খাবার দিয়ে ইফতার করলেও তিনি খেজুর দিয়ে বা সামান্য খিঁচুড়ি দিয়ে। তারপর তিনি ভাত খেয়ে নেন। তার যুক্তি হলো খেজুর, আঙ্গুর বা আপেল দিয়ে খুব হালকা ধরণের ইফতার করার পরে নামাজ পড়ে স্বাভাবিক খাদ্য খেয়ে পরে অবসর সময় প্রয়োজন বোধে অন্যান্য খাবার খাওয়া যেতে পারে। সারাদির অভুক্ত থেকে হঠ্যাৎ তেলে ভাজা, ঘিয়েভাজা অর্থ্যাৎ তৈলাক্ত খাবার গ্রহণের ফলেই আমাদের অসুখ হয়। এটি নতুন কোন কথা নয়। কথাটি আমরা সবাই জানি। কিন্তু চর্চা করি না। তাই তিনি তারমতো খাদ্যগ্রহলে আমাদেরও উৎসাহিত করেন।
২০০৬ সাল থেকে আমরা তার থিওরী অনুসরণ করতে থাকি এবং সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত রমজান মাসে আমাদের পেটের কোন পীড়ার কথা শুনিনি। এমনকি স্বাভাবিক খাদ্যগ্রহণের ফলে ইফতারের পরে কাজে অথবা তারাবির নামাজের সময়ও ক্লান্ত বলে মনে হয়না। আপনি চানা, পিঁয়াজি, ডালের বড়া এসব খেতে চাইলে আপত্তি নেই, তবে সেগুলো খাবেন ইফতার পরে ভাত খাওয়ার আরও কিছুক্ষণ পরে চায়ের সাথে। এতে আপনি শুধু ডাইবেটিক কিংবা হার্টের অসুখ কিংবা প্রেসার নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রেই নং বরং খাদ্যেে অপচয় রোধ করতে সক্ষম হবেন। আমরা ২০০৬ সালে আরম্ভ করেছি। আমাদের পরিবারগুলো এখন তা অনুসরণ করছে। আপনিও এই ব্যতিক্রমধর্মী চর্চাটা করে দেখুন। ভালো না লাগলে করবেন না। আর যদি ভালো লাগে তা হলে অভ্যাসটা অব্যাহত রাখুন। মনে রাখবেন আমাদের কাউকে তা শুরু করতে হবে। একবার শুরু হয়ে গেলে দেখবেন বাকিটা হবে বিজ্ঞানের ফর্মূলার মতো একে অন্যকে অনুসরণ করে। আসন্ন রমজান শুভ হোক।

faruque024@yahoo.co.uk