প্রচ্ছদ নারী সংবাদ নারী গুরুত্ব পান মাত্র ১০ শতাংশ সংবাদে

নারী গুরুত্ব পান মাত্র ১০ শতাংশ সংবাদে

487
0
SHARE
মানসুরা হোসাইন: গত বছর বিশ্বের গণমাধ্যমে নারীর বিষয় গুরুত্ব পেয়েছিল মাত্র ১০ শতাংশ সংবাদে। ২০০০ সালেও হার একই ছিল। ২০০০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত এই ১৫ বছরে বিশ্বব্যাপী নারী সাংবাদিকের সংখ্যা বেড়েছে। তবে বৃদ্ধি পাওয়ার হার কম, মাত্র ৬ শতাংশ।
‘গ্লোবাল মিডিয়া মনিটরিং প্রজেক্ট ২০১৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই পরিসংখ্যান দেওয়া হয়েছে। ১৪৪টি দেশের তথ্য সংগ্রহ করে তাতে বলা হচ্ছে যে সংবাদপত্র, টেলিভিশন চ্যানেল ও রেডিওতে নারী সাংবাদিকের তৈরি করা প্রতিবেদন বাড়ছে না। ২০০৫ সালে নারী সাংবাদিকদের তৈরি করা প্রতিবেদন ছিল ৩১ শতাংশ। ২০১৫ সালেও হারটি একই ছিল।
ওয়ার্ল্ড অ্যাসোসিয়েশন ফর ক্রিশ্চিয়ান কমিউনিকেশনের (ডব্লিউএসিসি) গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি উদ্যোগে গ্লোবাল মিডিয়া মনিটরিং প্রজেক্ট এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে। গত নভেম্বরে প্রকাশিত এই প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছে জাতিসংঘের বিজ্ঞান ও শিক্ষাবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো, নারীবিষয়ক সংস্থা ইউএন উইমেনসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। ১৯৯৫ সাল থেকে প্রতি পাঁচ বছর পর পর এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হচ্ছে। ডব্লিউএসিসির কার্যালয় যুক্তরাজ্য ও কানাডায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১১৪টি দেশে টেলিভিশনে নারী সাংবাদিকদের অর্ধেকের বয়স ১৯ থেকে ৩৪ বছরের মধ্যে। ২৮ শতাংশ নারী সাংবাদিকের বয়স ৩৫ থেকে ৪৯ বছরের মধ্যে। অন্যদিকে রেডিও ও টেলিভিশনের ৮৩ শতাংশ উপস্থাপিকাই এই বয়সী। গণমাধ্যমে, বিশেষ করে টেলিভিশনে ৬৫ বছর বয়সী নারী সাংবাদিক খুঁজেই পাওয়া যায় না। তবে ওই বয়সী পুরুষ সাংবাদিকের উপস্থিতি ঠিকই থাকে।
প্রতিবেদনে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের গণমাধ্যমে নারী-পুরুষের বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ৮৪ শতাংশ পুরুষ, আর ১৬ শতাংশ নারী। এর মধ্যে সংবাদপত্রে ৮ শতাংশ, রেডিওতে ৩৩ শতাংশ এবং টেলিভিশনে ১৯ শতাংশ নারী সাংবাদিক। তবে রেডিওতে ৬৭ শতাংশ ও টেলিভিশনে ৬৬ শতাংশ উপস্থাপিকা নারী। সার্বিকভাবে এ দুই মাধ্যমে ৬৬ শতাংশ নারী ও ৩৪ শতাংশ পুরুষ উপস্থাপক হিসেবে কাজ করছেন।
১১৪টি দেশের স্বেচ্ছাসেবক, সুশীল সমাজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, গণমাধ্যমকর্মী এবং অন্যরা মিলে ১৫৮ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনের তথ্য সংগ্রহ করেন। প্রতিটি দেশে একজন করে সমন্বয়কারী ছিলেন। পরিমাণ ও গুণগত তথ্যের জন্য মানসম্পন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। পরিমাণগত তথ্যের মধ্যে ছিল: সংবাদ জগতে নারী ও পুরুষের সংখ্যা, কোন ধরনের সংবাদে নারী বা পুরুষ সম্পৃক্ত থাকেন, কোন ধরনের সংবাদে নারী বা পুরুষ সাংবাদিকের কী ভূমিকা থাকে ইত্যাদি। গুণগত তথ্যের জন্য সংবাদ কভারেজের মান দেখা হয়।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ৪৯ শতাংশ প্রিন্ট, ১১ শতাংশ রেডিও এবং টেলিভিশনের ৪০ শতাংশ সংবাদের পর্যালোচনা করা হয়। এতে ৭১৪টি প্রতিবেদন ছিল। অন্যদিকে ইন্টারনেট বা অনলাইনের ২৪টি প্রতিবেদন বা সংবাদকে পর্যালোচনা করা হয়। বাংলাদেশে সংবাদে নারীর জায়গা পাওয়ার হার ১৮ শতাংশ। অন্যদিকে পুরুষের উপস্থিতি বা হার ৮২ শতাংশ।
১৯৯৫ সালে চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনে বেইজিং কর্মপরিকল্পনায় ১২টি উদ্বেগের মধ্যে নারী ও গণমাধ্যমকেও চিহ্নিত করা হয়। গণমাধ্যমে কর্মরত নারীর সংখ্যা বাড়ানো এবং নারীর চিরাচরিত উপস্থাপন বন্ধের বিষয়টিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়। গ্লোবাল মিডিয়া মনিটরিং প্রজেক্ট ১৯৯৫ সাল থেকে প্রতি পাঁচ বছর পর পর প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। তবে ২০১৫ সালের প্রতিবেদনটি বলছে, বেইজিং কর্মপরিকল্পনার ২০ বছর পূর্তি হলেও প্রতিবেদনে যে তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরা হয়েছে, তা খুবই উদ্বেগজনক। রেডিও, টেলিভিশনের সংবাদে নারীর উপস্থিতি মাত্র এক-চতুর্থাংশ। গণমাধ্যমে বিশেষজ্ঞ হিসেবে মাত্র ১৯ শতাংশ নারীর মতামত নেওয়া হচ্ছে। নারীবিষয়ক সংবাদ বেশি তৈরি করছেন নারীরাই।
এশিয়ায় ২০০০ সালে নারী সাংবাদিকের সংখ্যা ছিল ৩১ শতাংশ, ২০১৫ সালেও তা একই আছে। রেডিওতে উপস্থাপিকার সংখ্যা ২০০০ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত ৪১ শতাংশই আছে। টেলিভিশনে উপস্থাপিকার সংখ্যা বেড়েছে ১ শতাংশ, অর্থাৎ ৫৬ শতাংশ থেকে ৫৭ শতাংশ হয়েছে। মোট উপস্থাপিকার সংখ্যা ৪৯ শতাংশেই আটকে আছে। গণমাধ্যমে কর্মরতদের মধ্যে মাত্র ২০ শতাংশ নারী প্রাতিষ্ঠানিক চাকরি করছেন। ৬৭ শতাংশ নারীই বিভিন্ন চুক্তিভিত্তিক কাজের সঙ্গে যুক্ত। ডিজিটাল মিডিয়া বা ইন্টারনেট, টুইটারের ক্ষেত্রেও নারীর অংশগ্রহণ সে মাত্রায় বাড়েনি।
‘গ্লোবাল মিডিয়া মনিটরিং প্রজেক্ট ২০১৫’ প্রতিবেদন ও দেশের গণমাধ্যমে নারীর উপস্থিতি বিষয়ে বেসরকারি টেলিভিশন নিউজ ২৪-এর প্রধান বার্তা সম্পাদক শাহনাজ মুন্নী প্রথম আলোকে বলেন, গণমাধ্যমে নারীদের প্রতি পদে পদে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হয়। এখনো নারী সাংবাদিকের সংখ্যা কম। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর সংখ্যা নগণ্য। গণমাধ্যম সমাজের বৈষম্যমূলক বিভিন্ন রীতি-নীতি পরিবর্তনে ভূমিকা পালন করে। তবে গণমাধ্যমের ভেতরে নারী-পুরুষের বৈষম্যের বিষয়টি বিশ্বব্যাপী তেমন আলোচনাতেই আসেনি। নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য নীতিনির্ধারক পর্যায়ে যাঁরা আছেন, তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হওয়া জরুরি।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ‘গণমাধ্যম ও নারী’ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে একটি উপপরিষদ গঠন করেছে। এই উপপরিষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সীমা মোসলেম প্রথম আলোকে বলেন, গত ২০ বছরে গণমাধ্যমে নারীর প্রতি সংবেদনশীলতা বেড়েছে। তবে গণমাধ্যমে নারীর বেলায় শব্দ চয়ন বা উপস্থাপনে ঘাটতি রয়ে গেছে। নারীর কাজের সুযোগও ততটা বাড়েনি। নারী সাংবাদিকের সংখ্যা শতাংশের বিচারে এখনো অনেক কম। নারীদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যেতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হচ্ছে।
বৈশ্বিক এই প্রতিবেদনে কিছু ইতিবাচক চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, এশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক ও অপরাধবিষয়ক সংবাদ তৈরিতে নারীরা এগিয়ে আছেন। আফ্রিকা ও এশিয়ায় ডিজিটাল মিডিয়ায় সহিংসতা ও অপরাধবিষয়ক খবরে নারীর উপস্থিতি বেড়েছে। অন্যদিকে বর্তমানে পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হিসেবে নয়, এ ধরনের নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো নারীর উপস্থিতিও গণমাধ্যমে বেড়েছে। নারীরা এখন আগের চেয়ে গণমাধ্যমে বেশি অভিজ্ঞতার কথা বলছেন।

কৃতজ্ঞতায়: প্রথম আলো

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here