প্রচ্ছদ কবিতা জালালুদ্দিন রুমির কবিতা

জালালুদ্দিন রুমির কবিতা

849
0
SHARE
অনুবাদ : কাজী জহিরুল ইসলাম
ত্রয়োদশ শতকের ফার্সি কবি জালালুদ্দিন রুমি ছিলেন সুফি সাধক এবং কালক্রমে হয়ে ওঠেন সুফি গুরু। তিনি কোথায় জন্মগ্রহণ করেন তা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। তাঁর পুরো নাম জালাল আদ-দীন মুহাম্মদ রুমি বলখি। খোরাশানের বলখ শহরে জন্মেছেন বলেই তাঁর নামের সাথে বলখি যোগ হয়েছে। জায়গাটি বর্তমান আফগানিস্তানে। তবে মতান্তরে বৃহত্তর বলখ অঞ্চলের বখশ নদীর তীরে অবস্থিত ‘ওয়াখশ’ গ্রামে তাঁর জন্ম, যেটি বর্তমানে তাজিকিস্তানে অবস্থিত। শুধু মুসলিম বিশ্বেই নয়, রুমি ব্যাপক জনপ্রিয় পশ্চিমা বিশ্বেও। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এখন সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং বেস্ট সেলার কবি জালালুদ্দিন রুমি। ইশকের সাধনা যে রহস্যময়তার ঘোর তৈরি করেছে তাঁর কবিতায় সেই ঘোরে এখনো, সাত শ’ বছর পরের আধুনিক মানুষও বুঁদ হয়ে থাকেন। কবিতাগুলো পড়তে গিয়ে মনে হলো, আমার পাঠ অভিজ্ঞতা বাংলা ভাষার পাঠকদের সাথে শেয়ার করলে কেমন হয়।
অনেকেই রুমি অনুবাদ করেছেন, আমিও করছি। রবার্ট ফ্রস্ট বলেছেন, ‘অনুবাদ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যা হারিয়ে যায় তাই কবিতা।’ এই কবিতাগুলো মূল ফার্সি থেকে ইংরেজি হয়েছে, সেখান থেকে আমি বাংলা করছি। সুতরাং এই বঙ্গানুবাদে রুমির কাব্যিক দ্যোতনার কিছুই আর অবশিষ্ট থাকার কথা নয়। ইংরেজিটি পড়তে গিয়ে আমি খুব বেশি কবিতা পাইনি, পেয়েছি বাণী ও বিষয়বস্তু। সেটিকে সম্বল করে রবার্ট ফ্রস্টের মতো আমিও একটি চেষ্টা করেছি। আমি যোগ করেছি আমার কাব্যগুণ। যারা ফার্সিতে রুমি পড়েছেন, তারা হয়তো বলতে পারবেন, আমার এই ঘোরাশ্রয়ী চেষ্টা কতখানি সঠিক। একজন কবি যখন অন্য কবির কবিতা অনুবাদ করেন তখন আর ট্রান্সলেশন থাকে না, হয়ে যায় ট্রান্সক্রিয়েশন। নিচে দ্য সুফি মাস্টার জালালুদ্দিন রুমির কয়েকটি কবিতার বঙ্গানুবাদ উপস্থাপন করা হলো।

মহান প্রভুর কলম

হাঁটতে গিয়ে অসাবধানে পড়ছে ফাঁদে পা
প্রভাব প্রতিপত্তি লোভে প্রলুব্ধ ক্ষেপা
ছোঁয় না তবু বিপদ আমায় ছোঁয় না অঘটন
সঙ্গে আছো প্রভু তুমি কৃপা অকৃপণ।
প্রতি রাতেই আত্মাটাকে মুক্ত করে দাও
দেহের খাঁচা ফেলে পাখি উড়াল দিয়ে যাও
মনকে ধুয়ে সাফ করে দাও, পৃষ্ঠা সাদা এক
সেই কাগজে আবার বলো, নতুন করে লেখ
রাত্রী গভীর হলেই কারা মুক্ত হয়ে যায়
মুক্ত মাঠে বন্দী মানুষ অন্দরে ঘুমায়
প্রতাপশালী বাদশাহ তখন বড়ই অসহায়
দম্ভ-দাপট প্রাসাদ ছেড়ে অরণ্যে পালায়
সুখের নদী তরঙ্গহীন দুঃখ ডুবে তল
মোহ-মায়ার পৃথিবীটা পাথর জগদ্দল
নিদ্রাহীন এক সাধু দেখো মগ্ন অচেতন
কেউ জানে না এই ঘুমে তার কাটবে কতক্ষণ
এমনও তো কেউ রয়েছে ঘুমন্ত মানব
জগৎ জীবন তুচ্ছ শুধু নিদ্রাদেবীই সব
মহান প্রভুর কলম সে লোক যাচ্ছে লিখে রোজ
তিনিই কেবল জানেন জগৎ-রহস্যটার খোঁজ।
বসন্তের হাওয়ায়
প্রিয়তমা প্রোজ্জ্বল সূর্যের মতো / প্রেমিকেরা আবর্তিত গ্রহ
বসন্ত-হাওয়ায় প্রেম বহে অবিরত / ভেজা ডাল নৃত্যে করে বিদ্রোহ।

তুমিই আনন্দ

হে স্রষ্টা, আমাদের কলুষিত চক্ষুগোলকের দৃষ্টি
ঝাপসা, প্রায়ান্ধ; স্ফীত আমাদের মোহান্ধ পাপের বোঝা
পূর্ব থেকে পশ্চিম অবধি ছড়ানো তোমার যত সৃষ্টি
সর্বত্রই লুকিয়ে তুমি, আমাদের শুধু নিরন্তর খোঁজা।
সূর্যালোকের চেয়েও অধিক প্রোজ্জ্বল, জ্বলে আছো তুমি
এবং আমাদের চেতন সত্তার অস্তিত্বের জীবন্ত বারুদ
তোমার স্পর্শেই বিকশিত হয় আদিগন্ত মনোভূমি
বিস্ফোরণের মতোই তোমার নামের কল্যাণী দরুদ
আমাদের ঘুমন্ত নদীগুলোকে করে তোলে স্ফীত।
তোমার অস্তিত্ব লুকোনো রয়েছে অতি সুকৌশলে
তোমার তাবৎ উপহার প্রকাশ্য এবং অবারিত।
আমরা তো কেবল তৃষ্ণার্ত পাথর সমুদ্রতটে দলে দলে
তুমিই রহমতের জলধারা, ভেজাও নিয়ত আমাদের
তুমি প্রবহমান বাতাস, আমরা তো ধূলিকণা মাত্র
সকলেই দেখে নড়াচড়া, ওড়াউড়ি, ধূলিঝড়ের
অদেখা বায়ুর মতো প্রবাহিত তুমি অহোরাত্র।
তুমিই অদৃশ্য বসন্তের বায়ু, আমি দিগন্তের সবুজ বনানী
তুমি অন্তর্নিহিত শক্তি, আমি তো কেবল অসার হাত ও পা
তুমি উপস্থিত বলেই নড়ে ওঠে আমাদের হস্ত-পদখানি
আমি তো শুধুই কণ্ঠস্বর, তোমার জ্ঞানই অস্তিত্বে রোপা
আমাদের এই হাঁটাচলা বিশ্বাসেরই নিরন্তর প্রতিভূ
অনন্ত স্বাক্ষর সন্দেহাতীত তোমার অমোঘ অস্তিত্বের
আমি তো কেবলই এক প্রায়ান্ধ প্রদীপ, নিভু নিভু
তোমার স্পর্শেই জ্বলে উঠি নিয়ত, ঘোষণা করি বিজয়ের।
মাথার ওপর অহরহ বাসা বাঁধে সময়ের ধূলিকণা
মেঘের জেলাবি খুলে আকাশ দেখায় কী নিখুঁত তার পেট
তোমার এ দাস কী করে লিখবে বলো গুণের বর্ণনা?
আমার এ আত্মা হোক তোমার পদতলে বিছানো কার্পেট।

গুপ্তধনের সন্ধ্যান

সুস্থ এ দেহখানি করে নিশ্চিত
ইন্দ্রিয়ের অনুভূতি, পার্থিব সুখ।
কামনার বেলুন ক্রমস্ফীত
আনন্দে ঝলমল, প্রফুল্ল মুখ।
পোকার দখলে যখন এ দেহ, নশ্বর
আত্মার উত্থান নতুন চরের মতো
অসাড় এ দেহখানিই আত্মার ঘর
এখানেই বসতি করে, এখানেই ব্রত।
ঘরখানি ভেঙেচুরে অবিরাম কসরত
খোঁড়াখুঁড়ি চলে শুধু দেহের ভেতর
গড়ে তোলে সহসাই নতুন ইমারত
লুকানো সে ধন যেন পরশপাথর।
বহমান নদীটিও থামায় স্রোতধারা
থিতিয়ে সাফ করে বুকের আবর্জনা
নতুন নদীর বুকে স্বচ্ছ জলধারা
থাকে না বুকে আর অশুভ পাথরকণা।
গায়ে যদি বিঁধে যায় ধারালো তীরখানি
মাংস না কেটে বলো উপায় বা আছে কত
ব্যথায় কাঁদবে তুমি এ কথা ভালোই জানি
তীরখানি খুলে নিলে তবেই না সারে ক্ষত।
হতবাক হও, মুখ ফেরাও
এটা কে বলতে পারে
যে একজনের পথ মিলিত হয় না কখনোই অন্য কারো পথের সাথে?
আমি যা বলি তা তো এক প্রচেষ্টা কেবল
ক্ষণিকের, মুহূর্তের প্রয়োজনে।
কখনো কখনো স্রষ্টার নির্দেশ এ পথে
আবার কখনো ঠিক তার উল্টো
প্রকৃত ধর্মের কাজ বিভ্রান্ত বা হতবুদ্ধি করা
তবে তা এমন হতবুদ্ধি নয় যা তার কাছ থেকে
মুখ ফেরাতে উৎসাহিত করে
বরং তা এমন এক কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা যা তোমাকে করে
ইশকের দিওয়ানা, তুমি মাতাল হও প্রেমে,
নিমজ্জিত হও অচেনা এক আলোর অতলগহনে।
কারো বা ভয়ার্ত নতমুখ ফেরানো তার দিকে যার প্রেমে হয়েছে আশেক
কেউ শুধু দেখে নিজেকে
সকলেরই দৃষ্টি স্থির, লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট।
প্রাপ্তির ঝোলা শুধু ভরে ওঠে তার
চিনেছে যে প্রেম-মহিমা অপার।

হৃদয়ের নতুন মদ

মাটির এই দেহখানি হৃদয়ের পাত্রবিশেষ
আমার গেঁজেল ভাবনারস হৃদয়ের মদ
বীজ ফেটে তাতে হয় জ্ঞানের উন্মেষ
বলেছি যা আমি, তা-ই দিলের রসদ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here