প্রচ্ছদ প্রবন্ধ ছোটবেলার ঈদ

ছোটবেলার ঈদ

257
0
SHARE
মরিয়ম চৌধুরী: ছোটবেলার ঈদ মানেই ছিল অন্যরকম এক অনুভূতি। যা কোনভাবেই প্রকাশ করা সম্ভব নয়। রমজান শুরু হওয়ার সাথে সাথেই আমাদের দিন গোনা শুরু হয়ে যেতো—আর কতদিন বাকি ঈদের। আহারে! কতো পরিকল্পনাই না করতাম ঈদ নিয়ে।
ঈদে নতুন কাপড় বানানোর বিষয়টা ছিল সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ । জুতা, চুড়ি, গয়না, কপালের টিপসহ সবকিছু ম্যাচিং করে কিনতাম। তারপর  ঐগুলো লুকিয়ে রাখতাম যাতে অন্য কেউ না দেখে। কারণ, ঈদের কাপড় যদি কেউ দেখে ফেলে তাহলে ঈদ নষ্ট হয়ে যাবে । তবে রোজ একবার করে হলেও কাপড়, জুতাসহ সবকিছু খুলে দেখতাম আর অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় থাকতাম কাঙ্ক্ষীত দিনের।
ঈদের আগের দিন রাতে চাঁদ দেখা ছিল এক চমৎকার আনন্দদায়ক অনুভূতি। সবাই মিলে উঠোনে এসে একসাথে ঈদের চাঁদ দেখার পর যখন টিভিতে ক্রমাগত “রমজানের এই রোজার শেষে এলো খুশির: ঈদ গানটা বাজতে থাকতো, তখন চারদিকে যে আনন্দ  উৎসবের আমেজ সৃষ্টি হতো তা লিখে বুঝানো সম্ভব নয়। আমাদের মা, চাচীরা যখন ঈদের পিঠা আর রান্নাবান্না নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন, তখন আমরা ভাই-বোনেরা  মেহেদী মাখা আর ঈদের দিনের পরিকল্পনায় লিপ্ত থাকতাম। চাঁদ রাতে আমাদের আর ঘুম আসতো না, কখন সকাল হবে গোসল করে ঈদের নতুন কাপড় পড়ে বেড়াতে যাব সে ভাবনায়।
ভীষণ মনে পড়ে ঈদের দিন ভোরে  ঘুম থেকে উঠে কুয়োর পাড়ে বালতি দিয়ে পানি তুলে গোসল করার সেই মধুর স্মৃতি, যা কখনোই ভুলতে পারব না। নতুন কাপড় পড়ে সারাবাড়ি ঘুরে বেড়ানো আর মার হাতের সেমাই পরোটাসহ  বিভিন্ন ধরণের খাবারের স্বাদ ছিল অমৃতের মতো। এখনো তা জিহবায় ডগায় লেগে আছে।
ঈদের বিকেলে রিকশা করে খালা, মামাদের বাসায় বেড়ানোর আনন্দই ছিল আলাদা।বিশেষ করে বড়দের কাছ থেকে ঈদ সালামি পাওয়ার অনুভূতি ছিল অসাধারণ। কতো আনন্দ উল্লাসে কাটতো আমাদের সে বেলার ঈদ।
বড়বেলায় এসে এখন আর সেই আমেজ খুঁজে পাই না। পুরোনো সবকিছু এখন রূপকথার মতো মনে হয়।এখন ঈদ মানে-ই দায়িত্ব পালন, রান্না -বান্না, পরিবারের  ছোট বড় চাহিদা মেটানো। শুধু মনে পড়ে সেই ছোটবেলায় যখন আমরা মেহেদি মাখা আর ঈদের দিনের পরিকল্পনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম, তখন আমদের মা, চাচীরা হাসিমুখে রান্না ঘরে কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। আজ আমি বড়বেলায় ঈদের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে আমার মা, চাচীদের সেই হাসিমুখ নিয়ে এতো কাজ করার রহস্য জেনেছি। হাজার কষ্টের মধ্যেও নিজ পরিবারের দায়িত্ব পালন করার পেছনের আনন্দ-ই ছিল সেই হাসির রহস্য। পরিবারের দায়িত্ব পালনের মধ্যে যে আনন্দ কি ,তা এখন মা হয়ে নিজের সংসার পরিচালনা করে বুঝতে পারছি। তবে দুঃখের ব্যাপার হলো, আমরা যে ঈদ আনন্দ উদযাপন করে বড় হয়েছি এই প্রজন্মের বাচ্চারা কি সেই অনাবিল আনন্দের কোন অনুভূতি অনুধাবন করতে পারছে? মনে হয় না। তবে আমি সবসময় চেষ্টা করি কিছুটা হলেও ঈদের আনন্দ উল্লাসের অনুভূতিটা আমার ওদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে। চেষ্টা করি সেই পুরনো আনন্দধারাকে  কিছুটা হলেও নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাঁচিয়ে রাখতে!
ঈদ মোবারক। সবার প্রতি ঈদের শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।