প্রচ্ছদ ফিচার চ্যানেল এস এর তেরোতম জন্মদিনে বিলেতের বাংলা মিডিয়ার ভবিষ্যৎ ভাবনা

চ্যানেল এস এর তেরোতম জন্মদিনে বিলেতের বাংলা মিডিয়ার ভবিষ্যৎ ভাবনা

373
0
SHARE
আজ একসাথে দুটো জন্মদিন পালন করলাম। একটি ছেচল্লিশ বছর আগে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের। অপরটি বাংলাদেশের ভাষা ও সংস্কৃতিকে বহির্বিশ্বে লালন করতে বিলেতে জন্মনেয়া টেলিভিশন চ্যানেল এস এর।
জন্মের পর থেকে চ্যানেল এস- প্রতিষ্ঠা বার্ষির্কীটির দিনটি উদযাপন করে আসছে ঘটা করে। বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানমালার পাশাপাশি নিজেদের জন্মদিনের নানা আয়োজন থাকে টানা কয়েকদিন ধরে। তবে জমজমাট যে অনুষ্ঠানটি হয় তা হলো কমিউনিটির বিভিন্নস্তরের মানুষকে নিয়ে কেক কাটার লাইভ অনুষ্ঠান। যে অনুষ্ঠানে সাংবাদিক, সাহিত্যিক, কুটনীতিক, রাজনীতি, শিল্পী, কমিউনিটি এক্টিভিষ্ট সকলের স্বতষ্ফুর্ত সমাগম ঘটে।

 

এ বছরও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আয়োজনে তার কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। বিগত বছরগুলোর ন্যায় জাঁকজমক আয়োজনেই সাজানো হয়েছিলো টিভি প্রাঙ্গন । স্মৃতি যদি প্রতারণা না করে তাহলে বলতে পারি, বিগতদিনের সবগুলো অনুষ্ঠানেই আমার অংশগ্রহণের সুযোগ হয়েছিলো । শুধু একটি বছর পারিনি। ২০০৭ সালে ডিসেম্বরে স্বপরিবারে বাংলাদেশে ছিলাম।
প্রতি বছর অনুষ্ঠানের নির্দিষ্ট দিন তারিখ ঘনিয়ে এলে চ্যানেল এস থেকে ঝড়ো বেগে দাওয়াত আসতে থাকে । প্রথমে টেকস্ট, পরে রিমাইন্ডার এর পর টেলিফোনে মৌখিক অনুরোধ । অনুষ্ঠানটিতে উপস্থিত না হয়ে পারা যায়না। উপস্থিত না হলে মনে হয় কিছু একটা যেনো মিস করছি। কারণ এই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সহকর্মী সাংবাদিকদের একটি সম্মিলনী হয়ে যায়। কমিউনিটির পরিচিতজনের মিলন ঘটে। একটা উৎসব উৎসব ভাব থাকে সারাদিন।
সবগুলো অনুষ্ঠানই হয় প্রাণবন্ত । বিশেষকরে জন্মদিনের অনুষ্ঠানটি মনে হয় আমাদের নিজেদেরই অনুষ্ঠান। চ্যানেল এস টিম আমাদের আপন করে নেয় । হাসি, আড্ডার মধ্যদিয়েই কাটে একটি সন্ধ্যা ।

 

কমিউনিটি ভিত্তিক টেলিভিশন হিসেবে চ্যানেল এস একটি জনপ্রিয় ও সফল টেলিভিশন এটা নিসংকোচেই বলা যায় । তেরোতম জন্মদিনে চ্যানেল এস সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধি হচ্ছে, এই চ্যানেল কমিউনিটির মানুষের হৃদয়ে নিজেদের স্থান করে নিতে পেরেছে। মানুষ চ্যানেল এসকে ভালোবাসে। এটাই চ্যানেল এস এর সবচেয়ে বড় অর্জন। এটাই বড় প্রাপ্তি। এটা চ্যানেল এস টিমের সবচেয়ে বড় শান্তনা।
কোনো লেখকের লেখা যদি সুখপাঠ্য না হয়। লেখা যদি পাঠক পড়েনা। তাহলে তার লেখা নিরর্থক। সংবাদপত্রের যদি পাঠক না থাকে তাহলে পত্রিকা বের করে লাভ নেই। রেডিওর যদি শ্রোতা না থাকে তাহলে এই রেডিও অর্থহীন। ঠিক তেমনী কোনো টেলিভিশনের যদি দর্শক না থাকে তাহলে এটা টেলিভিশন নয়। গণমাধ্যম আসলে পাঠক ও দর্শক-শ্রোতাদেরই সম্পদ । তাদের ভলোলাগা না লাগার উপরই মিডিয়ার ভবিষ্যত নির্ভর করে। গার জোরে মিডিয়া চালানো যায়, কিন্তু সেটি জনগণের সম্পদ হয় না।
চ্যানেল এস একটি জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেল। কেন জনপ্রিয়? কারণ এই টেলিভিশনের অগণিত দর্শক আছে। ইউরোপে বাংলা টেলিভিশনের দর্শক কারা? আমরা, অর্থাৎ বাংলাদেশ থেকে যারা বড় হয়ে এসেছি। যারা বাংলা বুঝি। বাংলা চর্চা করি। কিন্তু আমরা কতদিন এই টিভিগুলোর দর্শক থাকতে পারবো। খুব বেশি দিন নয়। বড়জোর ৩০ থেকে ৪০ বছর। গড় আয়ু হিসেবে এর মধ্যেই আমাদেরকে বিদায় নিতে হবে।

 

আমরা চলে যাওয়ার পর বাংলা টিভিগুলোর দর্শক হবে কারা? নিশ্চয় আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম। আমাদের সন্তানেরা। কিন্তু তারা কি ঘরে বাংলায় কথা বলতে পারে। জ্বি এবং জ্বি না ছাড়া অধিকাংশই বেশি কিছু বলতে পারে না। অনেকে জ্বি, জি-না বলতে জানলেও বলেনা। তাদের কাছে বাংলা আজগুবি ভাষা মনে হয়। অভিভাবকরা চান তার সন্তানেরা তার মতোই বাংলায় কথা বলুক । বাংলা শেখাতে চেষ্টারও কমতি করেন না। ঘরে বাংলার শিক্ষক রেখে চেষ্টা করেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়না। বাংলার প্রতি তাদের কোনো আগ্রহ নেই। যারা বাংলায় কথা বলতে পারেনা, তারা বাংলা টিভি দেখার তো প্রশ্নই আসেনা।
অবশ্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারা বাংলা টিভি দেখেও থাকে। তবে স্বতষ্ফুর্ত হয়ে নয়, নিরুপায় হয়েই। যেমন রাত দশটার আগে ঘরে ফিরতে পারলে বাংলা টেলিভিশনে রাতের সংবাদটি দেখে নেয়া আমার একটি নিয়মিত রুটিন । আর সংবাদ দেখার জন্য বেছে নিতে হয় চ্যানেল এস। কারণ চ্যানেল এস-এ একটি সুসংগঠিত নিউজ টিম আছে। সপ্তাহের সাতদিনই তাঁরা সংবাদ প্রচার করেন। কমিউনিটির উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলী চ্যানেল এস পর্দায় উঠে আসে। অনেকটা ‘মিরর অব দ্যা কমিউনিটি’র মতোই। আয়নায় তাকালে যেমন মুখ দেখা যায়, তেমনী চ্যানেল এস এর সংবাদ দেখলে কমিউনিটির একটি চিত্র চোখের সামনে ভেসে আসে।
যেকথা বলতে চেয়েছিলাম। দশটার আগে ঘরে ফিরলে আমার পাঁচ বছরের ছোট্ট ছেলেটিও বুঝতে পারে- বাবা চলে এসেছেন, তিনি এখন রাতের সংবাদ দেখবেন। অধঘণ্টার জন্য আমাদেরকে টেলিভিশনটি ছেড়ে দিতে হবে। তাই ঘড়ির কাটা রাত ১০টায় পৌছার আগেই স্কাই নাম্বার যেনো স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তন হয়ে চ্যানেল এস-এ চলে যায়। অর্থাৎ ছেলেটিকে (মিকাইল মাহমুদ) বলতে হয়না, আমি চ্যানেল এস দেখবো। স্কাই নাম্বার পরিবর্তন করো। সে তার শিশু মন থেকেই উপলব্ধি করতে পারে এবং পরিবর্তন করে দেয়। বাংলা টিভিগুলোর মধ্যে শুধু চ্যানেল এস এর স্কাই নাম্বারটাই সে জানে।
অনেকটা নিরুপায় হয়েই সে আমার সাথে বসে। বাংলা সংবাদ দেখে। তারা বাংলা বুঝেনা, কিন্তু বিভিন্ন ফুটেজ দেখে জানতে চায় এটা কী, ওটা কী। তবে বিজ্ঞাপন বিরতিটা তাদের জন্য কিছুটা উপভোগ্য । কারণ অভিনয়ধর্মী কিছু বিজ্ঞাপন থাকে, যার ভাষা বুঝতে না পরলেও অভিনয়ের ভঙ্গিমা তাদেরকে আনন্দ দেয়।

 

আরো একটি মজার বিষয়, টেলিভিশনে যারা নিয়মিত রিপোর্ট করেন তাদের অধিকাংশকে তারা চিনে এবং তারা মনে করে রিপোর্টারদের সকলেই আমার বন্ধু। বিশেষকরে চীফ রিপোর্টার মুহাম্মদ জুবায়ের, সিনিয়র রিপোর্টার ইব্রাহিম খলিল এই দুজন আমার বন্ধু হবেন- এটা তাদের ধারণা।
একদিন মিকাইল আমার কাছে আমার একজন বন্ধুর নাম জানতে
চাইলো । রসিকতা করে বললাম, বাবা আমার তো কোনো বন্ধু নেই। সে চটজলদি বলে ওঠলো। নাহ, বাবা আছে। বললাম কে? বললো চ্যানেল এস আংকেল। এই দুজনকে তারা চ্যানেল এস আংকেল হিসেবেই চিনে।
সেযাক, আসলে উপরের বর্ণনা ধান ভানতে শিবের গীতের মতো মনে হত পারে। ব্যক্তি জীবনের এই ধারাবিবরণী দেয়ার একটি কারণ আছে।
কারণ হচ্ছে, আমার এই ছেলেটি তো নিরুপায় হয়ে বাংলা টেলিভিশন দেখছে। বাবা দেখেন তাই তাকে সম্মান করে সে দেখছে। আধঘণ্টা সময় টিভিটি সে বাবার জন্য উৎসর্গ করে দিয়েছে। আমি যখন ঘরে নেই তখন তো তাকে বাংলা টেলিভিশন দেখতে হচ্ছে না । আমি, আমরা যখন বেঁচে থাকবো না তখন তো তাদেরকে বাংলা টেলিভিশন দেখতে হবেনা। তাহলে তখন বাংলা টেলিভিশনের দর্শক হবেন কারা? কে দেখবে টেলিভিশন? এটা একটি বড় প্রশ্ন। আমরা নতুন প্রজন্মকে যদি বাংলা শেখাতে না পারি, তাহলে আজ থেকে ৩০-৩৫ বছর পর টেলিভিশনগুলো দর্শকশুন্য হয়েপড়ার আশংকা মোটেও অহেতুক নয় । আর দর্শকশুন্য হলে কি কোনো টেলিভিশন টিকে থাকার সুযোগ আছে।

 

চ্যানেল এস নতুন প্রজন্মের জন্য কিছু অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে থাকে। তাদের আকৃষ্ট করতে কর্তৃপক্ষের চেষ্টা ও আন্তরিকতার কমতি নেই। কিন্তু কীভাবে সেই চেষ্টা ফলপ্রসু করা যায়, তার একটি পথ খুঁজে বের করা দরকার । তাহলে প্রবাসে বাংলা মিডিয়া বাঁচবে। বাঁচবে আমাদের বাংলা ভাষা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি। আমাদের সন্তানেরা মায়ের ভাষায় কথা বলতে পারবে। আমাদের বাঙালিয়ানার ধারাবাহিকতা কয়েক যুগের জন্য হলেও হয়তো টিকে থাকবে। নতুবা একসময় এখানে বাংলা বলতে কিছুই থাকবে না।
বৃটেনে যে পাঁচ লাখ বাংলাদেশীর বসবাস ছিলো। এখানে একটি শক্তিশালি কমিউনিটি ছিলো। এখানকার বৃটিশ সোসাইটিতে বাংলাদেশীদের অনেক অবদান ছিলো। তা কেউ মনে রাখবে না। মনে রাখারও কেউ থাকবে না। নদীগর্ভে যেমন বিলীন হয়ে যায় জনবহুলবসতি, তেমনী এই বিলেতে আমাদের সরব উপস্থিতি, অর্জন সবকিছুই বিলীন হয়ে যেতে পারে। নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে বাংলাদেশীর নাম-নিশানা।
তাইসির মাহমুদ
সম্পাদক, সাপ্তাহিক দেশ
লন্ডন, যুক্তরাজ্য।